যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বাংলাদেশ, ভারতসহ ৬০টি দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। ইউএসটিআর-এর দাবি, দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে এবং সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) প্রকাশিত এ প্রস্তাবে ইউএসটিআর বলেছে, তারা নির্ধারণ করেছে যে ৬০টি অর্থনীতির কার্যক্রম, নীতি ও চর্চা ‘অযৌক্তিক’ এবং এগুলো মার্কিন বাণিজ্যের ওপর বোঝা সৃষ্টি করছে বা বাণিজ্যকে সীমাবদ্ধ করছে। কারণ এসব অর্থনীতি জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে পারেনি।
সংস্থাটি তদন্তাধীন অর্থনীতিগুলোর সব পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে। তবে তাদের ফেডারেল রেজিস্টার বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত কিছু ব্যতিক্রম থাকবে।
যেসব অর্থনীতির ইতোমধ্যে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অথবা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য ঠেকাতে আংশিক ব্যবস্থা চালু করেছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্য সব অর্থনীতির জন্য প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্কের হার ১২.৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ সেই ৫৪টি অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ইউএসটিআর অভিযোগ করেছে যে তারা জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই তালিকায় আরও রয়েছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য এবং ভিয়েতনাম।
ইউএসটিআর একটি বস্ত্র-সংক্রান্ত ব্যবস্থাও প্রস্তাব করেছে, যার আওতায় কিছু অর্থনীতি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও বস্ত্রপণ্য কম হারে ৩০১ ধারার শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে।
ইউএসটিআরের বিবৃতিতে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি মোকাবিলায় আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে মার্কিন শ্রমিকদের বৈশ্বিক বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়।
উল্লেখ, এই প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা অনুযায়ী উত্থাপন করা হয়েছে। এই ধারা মার্কিন সরকারকে এমন বিদেশি নীতি বা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, যেগুলোকে তারা মার্কিন বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য অন্যায্য বা ক্ষতিকর বলে মনে করে।
৩০১ ধারা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের একটি বিধান, যা ইউএসটিআরকে বিদেশি সরকারের এমন কার্যক্রম, নীতি বা চর্চা তদন্ত ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, যেগুলো অন্যায্য, অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক এবং মার্কিন বাণিজ্যের ওপর বোঝা সৃষ্টি করে বা বাণিজ্য সীমিত করে।
কোনো কার্যক্রম বা নীতি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন না হলেও এই বিধান ব্যবহার করা যেতে পারে।
ইউএসটিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কার্যক্রম, নীতি বা চর্চাকে অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করা যেতে পারে যদি তা ‘অন্যভাবে অন্যায্য বা বৈষম্যমূলক’ হয়।
ইউএসটিআর যখন নির্ধারণ করে যে কোনো কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তখন তারা অতিরিক্ত শুল্ক, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বা সংশ্লিষ্ট দেশের নীতি পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে অন্যান্য পদক্ষেপের সুপারিশ করতে পারে।
এই ক্ষেত্রে ইউএসটিআর বলছে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার অনুপস্থিতি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা বিকৃত করে। এর ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমায়, তারা সুবিধা পায়।
এটি এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করে, যারা জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে না। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩০৭ ধারার মাধ্যমে জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে রেখেছে।
ইউএসটিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক অর্থনীতি এখনো একই ধরনের আমদানি-নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ করেনি। ফলে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি পণ্য বৈশ্বিক বাজারে অবাধে প্রবাহিত হতে পারছে।
ইউএসটিআরের মতে, এর ফলে রপ্তানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই মার্কিন উৎপাদকরা অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।
সংস্থাটি আরও বলছে, জোরপূর্বক শ্রম ছাড়া উৎপাদিত পণ্য বিদেশি বাজারে স্থানচ্যুত হতে পারে এবং পরে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য বাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হতে পারে।
ইউএসটিআরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে অন্তর্ভুক্ত অর্থনীতিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট আমদানির ৯৯.৪০ শতাংশ আসে।
সূত্র: রয়টার্স



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.