ইরানি সামরিক কমান্ডাররা তাদের আকাশসীমায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমানের উড্ডয়ন রুট বা ফ্লাইট প্যাটার্ন চিহ্নিত করে ম্যাপ তৈরি করে থাকতে পারেন। এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
ইরানের ওপর পুনরায় হামলা চালানো হবে কি না, ট্রাম্পের সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে যাচ্ছে।
সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবারই ইরানের ওপর পুনরায় বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুরোধের কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন। সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আগামীকাল একটি অত্যন্ত বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু আমি এটি কিছু সময়ের জন্য স্থগিত করেছি; আশা করছি হয়তো চিরকালের জন্য, তবে সম্ভবত অল্প সময়ের জন্য। কারণ ইরানের সঙ্গে আমাদের বড় ধরনের আলোচনা হয়েছে এবং দেখা যাক এর ফল কী দাঁড়ায়।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন যে, ইরানের সামরিক বাহিনী পঙ্গু হয়ে পড়েছে এবং তাদের কোনো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ইরানের আকাশসীমায় বিমান অভিযান চালাতে সক্ষম হয়েছে, তবে সেখানে তাদের সম্পূর্ণ আধিপত্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। এর ফলে পাইলটদের উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের অভিযান চালাতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি মার্কিন পাইলটকে জীবিত বন্দি করতে পারত, তবে তা ওয়াশিংটনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করত।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এফ-১৫ই বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন পথ এখন ইরানের কাছে আরও বেশি অনুমানযোগ্য হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, মার্কিন যুদ্ধবিমান সফলভাবে ভূপাতিত করার ক্ষেত্রে ইরান ততটাই কাছাকাছি পৌঁছেছে।
গত মার্চ মাসে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে খবর পাওয়া যায়। এছাড়া সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত অন্তত ১৬টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে মোতায়েন করার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন পথ বা ফ্লাইট প্যাটার্ন তৈরিতে ইরানকে সহায়তা করে থাকতে পারে রাশিয়া।
ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সমঝোতা রয়েছে। একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক কর্মকর্তাদের স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহ করে ইরানকে সহায়তা করেছে।
ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি সরঞ্জাম এবং সেই সঙ্গে রুশ ও চীনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক মিশ্রণ। এর আগে জানা গিয়েছিল যে, ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের পর চীন ইরানকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাটারি সরবরাহ করেছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে বলে ট্রাম্প যে দাবি করছেন, তার সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ফাঁস হওয়া বেশ কিছু নথির মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ওই গোয়েন্দা তথ্যগুলো ইঙ্গিত করে যে, ইরানি বাহিনী মার্কিন নেতা ও তার উপদেষ্টাদের দাবির চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
গত সপ্তাহে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে যত ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ছিল, তার প্রায় ৭০ শতাংশ এখনও তাদের কাছে অক্ষত রয়েছে।
ইরানে মার্কিন হামলায় মূলত ভূগর্ভস্থ গুহার গভীরে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধবিরতির সময়টিকে কাজে লাগিয়ে ওইসব স্থাপনার ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করেছে এবং তাদের অস্ত্র ব্যবস্থাগুলো এখনও সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.