যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইরানে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত রোববার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জনগণকে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখতে হবে।’
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পেজেশকিয়ান আরও বলেন, এ পরিস্থিতিতে সমস্যা ও দুর্ভোগ থাকা স্বাভাবিক। তবে জনগণের সহযোগিতা ও জাতীয় ঐক্যের ওপর নির্ভর করেই এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
পেজেশকিয়ান এ বক্তব্য দিলেন এমন এক সময়, যখন ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র (এসসিআই) জানিয়েছে, পারস্য বর্ষপঞ্জির প্রথম মাসে (যা শেষ হয় ২০ এপ্রিল) মূল্যস্ফীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। আগের মাসের তুলনায়ও এ সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ভিন্ন পদ্ধতি ও তথ্যভান্ডারের ভিত্তিতে হিসাব করে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৭ শতাংশ, আগের মাসের চেয়ে বেড়েছে ৭ শতাংশ।
দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাব পুরোপুরি এক না হলেও উভয় পরিসংখ্যানেই দেখা যাচ্ছে—ইরানে মূল্যস্ফীতির হার দ্রুত বাড়ছে। গত কয়েক বছরে বিশ্বের যেসব দেশে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেড়েছে, ইরান তার মধ্যে অন্যতম। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেবল কমছে।
তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, গত মাসেও যেসব পণ্য তিনি কিনতে পারতেন, এখন সেগুলোর অনেক কিছুই কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই। তিনি বলেন, ‘শুধু আমি নই, আমার মনে হয় এখন সমাজের বেশির ভাগ মানুষেরই প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস কেনার সামর্থ্য নেই।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় আরও বেশি। ফলে মানুষের কমে যাওয়া আয়ের বড় অংশই এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনায় ব্যয় হচ্ছে।
এসসিআই জানিয়েছে, বছরের প্রথম মাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১১৫ শতাংশ। বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম তিন গুণের বেশি বেড়েছে।
এর মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৩৭৫ শতাংশ, রান্নার তেল ৩০৮ শতাংশ, আমদানি করা চাল ২০৯ শতাংশ, দেশীয় চাল ১৭৩ শতাংশ ও মুরগির মাংস ১৯১ শতাংশ। তুলনামূলক কম বেড়েছে মাখনের দাম, ৪৮ শতাংশ। শিশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ৭১ শতাংশ ও পাস্তার দাম ৭৫ শতাংশ।
রাজধানী তেহরানের এক কাবাবের দোকানে কাজ করা মাজিদ নামের এক তরুণ বলেন, গত কয়েক মাসে তিন দফা দাম বাড়াতে হয়েছে। তিনি বলেন, কলিজার দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সরবরাহকারীদের কারণ জিজ্ঞাসা করলে কেউ বলে সংকট আছে, কেউ বলে ভেড়া রপ্তানি হচ্ছে। সত্যি বলতে, কার্যকর নজরদারি নেই।
রাষ্ট্রীয় ভোক্তা ও উৎপাদক সুরক্ষা সংস্থা রোববার ইরানের ৩১ গভর্নরের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় বলেছে, রান্নার তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধি ‘অবৈধ’ এবং দাম আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে হবে। তবে ক্রমাবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নির্দেশনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
এদিকে গত দুই সপ্তাহে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন হয়েছে। রোববার তেহরানের খোলাবাজারে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দাঁড়ায় প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার রিয়াল। এক বছর আগে এ হার ছিল প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার রিয়াল।
ভর্তুকি, কুপন ও ‘শত্রুর ষড়যন্ত্র’
দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ভর্তুকি ও কুপন দেওয়ার পাশাপাশি মজুতদারির মতো কর্মকাণ্ড দমনের চেষ্টা করছে। সরকারের ধারণা, এসব কারণেও মূল্যবৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকার মধ্যেও সরকার এখনো সুস্পষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি।
রোববার ইরানের গণমাধ্যম জানায়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত সমঝোতাচুক্তির খসড়ার আনুষ্ঠানিক জবাব তেহরান পাঠিয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আলোচনার মানে আত্মসমর্পণ নয়।’
সরকার মাসে নগদ ভর্তুকি ও ইলেকট্রনিক ভাউচার দিচ্ছে, মানুষ যেন নির্দিষ্ট দোকান থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে। তবে ব্যক্তি প্রতি এ সহায়তার পরিমাণ মাসে ১০ ডলারের কম। অর্থসংকটের কারণে তা বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
মাসুদ পেজেশকিয়ান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আবদোলনাসের হেম্মাতি মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করলেও মূল কারণ হিসেবে যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দাম আদায় ও মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও বলেছেন তাঁরা।
ইরানের সংসদে কট্টরপন্থীদের আধিপত্য। কয়েকজন সংসদ সদস্য, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলো মূল্যবৃদ্ধিকে ‘সন্দেহজনক’ আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, সামরিক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার পর শত্রুরা এখন ‘অর্থনৈতিক প্রতিশোধের’ অংশ হিসেবে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ওফোগ নেটওয়ার্কের এক অতিথি গত শনিবার বলেন, ‘আমি চাই ইরানের জনগণ যেন শত্রুর তৈরি মূল্যবৃদ্ধির ফাঁদে না পড়ে। বড় বড় ঘটনা ঘটেছে, সামনে আরও বড় ঘটনা অপেক্ষা করছে। এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক অর্জনের তুলনা অতীতে আর কোনো সময়ের সঙ্গে করা যাবে না।’
তবে দীর্ঘমেয়াদি ইন্টারনেট বিধিনিষেধের কারণে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকতে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যেই ইরানে টানা ৭২ দিন ধরে ইন্টারনেট সেবা প্রায় বন্ধ।
সরকার, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ও ইন্টারনেট অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা স্তরভিত্তিক ইন্টারনেট–ব্যবস্থার বিরোধিতা করলেও তাঁরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত তাঁদের নয়। সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশেই এটি কার্যকর করা হয়েছে।
স্থানীয় অব্যবস্থাপনা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ, যুদ্ধ ও ইন্টারনেট বন্ধ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চরম চাপের মুখে পড়েছে।
দেশটির ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসা খাতের সংগঠন শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম কার্যত মৃত। এখন আমরা কেবল সমাধিফলক খুঁজছি।’
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.