ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, সংস্কারে বাধা: রেহমান সোবহান

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছেন, ঋণখেলাপিরা এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে এবং সংস্কারের পথে নিজেরাই বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং কাঠামোগত। তিনি বলেন, সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া—প্রথমে আইন, এরপর প্রশাসনিক কাঠামো, তারপর কার্যকর প্রয়োগ এবং সবশেষে ফলাফল মূল্যায়ন।

তিন দিনব্যাপী নবম সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিন রোববার ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পরিবর্তিত বিশ্বে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং নীতিগত পদক্ষেপ।’

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান-এর সঞ্চালনায় অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন সাবেক অর্থসচিব ও বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।

রেহমান সোবহান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য তাদের ভেতরে প্রকৃত নেতৃত্ব বা অঙ্গীকার কতটা আছে, তা স্পষ্ট নয়। অতীতে বড় ধরনের সংস্কার তখনই সফল হয়েছে, যখন তা জনগণের শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ছয় দফা আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি শক্তিশালী রূপরেখা হিসেবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

বর্তমানে গণভিত্তিক প্রচার দুর্বল উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার জনগণের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি দলের অনেক সদস্যই নিজেদের ইশতেহারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, আলোচকদের মধ্যে কতজন বাস্তবে সরকারে কাজ করেছেন বা সংস্কার বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই অভিজ্ঞতা না থাকলে সংস্কারের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রেহমান সোবহান বলেন, অনেকের কাছে সংস্কার একটি তাত্ত্বিক বা কেতাবি বিষয়। তবে পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, আইন পাস করানো বড় সমস্যা নয়; বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ।

পুলিশ সংস্কারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সংস্কারের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব, যখন তা বাস্তবে ফল দিতে শুরু করে। কয়েক বছর পর বাস্তব চিত্র যাচাই করাই হবে সংস্কারের আসল পরীক্ষা।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সংস্কার প্রস্তাব নতুন কিছু নয়; বহু বছর ধরে এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সরকারগুলো অনেক সময় অর্থসহায়তার কিস্তি পাওয়ার জন্য আংশিক অগ্রগতি দেখায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন দুর্বল থেকে যায়।

বিচার বিভাগীয় ও বাজেট সংস্কারের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে বড় উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুবই সীমিত। রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট একীভূত করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পারফরম্যান্সভিত্তিক বাজেট ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এতে সরকার জনগণকে জানাতে পারবে কোন খাতে ব্যয়ে কী ফলাফল আসছে। বর্তমানে শুধু ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়, কিন্তু ফলাফল বিশ্লেষণ অনুপস্থিত।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে নিম্নমানের সেবা এবং দক্ষতার ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। মূল সমস্যা রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতায়।

ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে খাদ্য, শিক্ষা ও কাজের অধিকার—এসব বড় সংস্কার এসেছে শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বিভক্ত হওয়ায় বড় সংস্কারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ চাপ তৈরি করা কঠিন হচ্ছে।

তিনি বলেন, সংস্কারের জন্য বিরোধী দলের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উচিত সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সরকারকেও নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা উল্লেখ করে রেহমান সোবহান অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, একটি সরকার তখনই প্রকৃত জবাবদিহিমূলক হয়, যখন তারা তাদের কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে জনগণের রায় গ্রহণে প্রস্তুত থাকে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.