দেশের চলমান অর্থনৈতিক চাপ ও বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে করের বোঝা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বেসরকারি খাতকে স্বস্তি দিতে করনীতি স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এবং চ্যানেল-২৪ ও দৈনিক সমকাল-এর সহযোগিতায় লাইভ “প্রাক-বাজেট আলোচনা: প্রেক্ষিত বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা” অনুষ্ঠান অদ্য সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসনে এবং আইসিসি বাংলাদেশ-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। আলোচনা সভায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিধারা অব্যাহত রাখতে রাজস্ব আহরণ পদ্ধতির অটোমেশন, সহজীকরণ, করজাল সম্প্রসারণ একান্ত অপরিহার্য। এছাড়াও তিনি করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লক্ষ টাকা করা, সর্বোচ্চ কর হার ২৫% নির্ধারণ, নন-লিস্টেড কোম্পানীর কর হার লিস্টেড কোম্পানীর ন্যায় ২৫% ধার্য করা সহ অগ্রিম ভ্যাট ব্যবস্থা বিলুপ্তকরণের প্রস্তাব করেন। সেই সাথে টেকসই ও স্থিতিশীল আর্থিক খাতের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতির আধুনিকায়ন, খেলাপী ঋণ হ্রাস ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা, উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন ও স্থায়ী বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নীতি সুদহার যৌক্তিকীকরণের উপর জোরারোপ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। দেশের শিল্প ও বাণিজ্যকে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাতগুলোতে আগামী বাজেটে নীতি ও আর্থিক প্রণোদনা সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব করেন তাসকীন আহমেদ। দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে অবকাঠামো খাতে টেকসই উন্নয়ন সহ বিশেষ করে পরিবহন ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক উন্নতকরণ, ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড প্রবর্তন এবং জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখতে জ্বালানি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানান বাণিজ্য সংগঠনটির সভাপতি। এছাড়াও সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ স্থানীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কার্যকর নীতি সহায়তা প্রদান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার সহ সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির বিকাশে সরকারের নিকট হতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন ঢাকা চেম্বার সভাপতি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলেন, বিগত সরকারের আমলে গৃহীত অযৌক্তিক কিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের কারণে সরকারের উপর আর্থিক চাপ রয়েছে, যা কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারিখাতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়াতে বিশেষ করে ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় হ্রাস ও সরকারি সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণের কোনো বিকল্প নেই। মন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের জিডিপির আকার প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ হলেও দেশের প্রায় ৭ কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র সীমায় বসবাস করছে। এছাড়াও তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এত বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যেও করদাতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, দেশে জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতার অভাবে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে বর্তমান সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে। আগামী বাজেটে ব্যবসায়ীদের উপর করের বোঝা বৃদ্ধি করা হবে না বলে আশ্বাস প্রদান করে তিনি বলেন, আগামীতে বেসরকারিখাতের সাথে নিবিড়ভাবে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-বাংলাদেশ (আইসিসিবি)-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকারকে বেসরকারিখাতের প্রতিবন্ধকতা সমূহ বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতার সাথে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে জিডিপিতে করের অবদান বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও সত্যিকার অর্থে সেটি বাস্তবায়নের সরকারের তেমন কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না বলে তিনি জানান। সেই সাথে ঋণের উচ্চ সুদ হার, বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাস এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে তিনি জরুরিভাবে বিকল্প উৎস খোঁজা ও মধ্যস্থতাকারীর উপর নির্ভরতা হ্রাসের আহ্বান জানান এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য একটি স্থিতিশীল ও অনুমেয় নীতি পরিবেশ নিশ্চিতের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসনে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে স্থিমিত হওয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সচল করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এছাড়াও বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উপর তিনি জোরারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের “আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ‘আর্থিক খাত’, ‘শিল্প ও বাণিজ্য’ এবং ‘অবকাঠামো’ চারটি সেশনের নির্ধারিত আলোচনায় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় কর ব্যবস্থার অটোমেশন, ভ্যাট কাঠামো সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো: সালিম সোলায়মান সহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ, প্রাক্তন সভাপতিবৃন্দ, গবেষক, অর্থনীতিবিদ সহ সরকারি-বেসরকারিখাতের প্রতিনিধিবৃন্দ উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.