স্বস্তির বাজেটের নতুন ভাবনা: বাড়তি কর নয়, অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করুন

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-আমেরিকা সংঘাতকে ঘিরে জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভের ওপর চাপ এবং ডলারের অস্থিরতা সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এই বাস্তবতায় একটি প্রকৃত স্বস্তির বাজেট এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

শোনা যাচ্ছে, সরকার আগামী বাজেটের আকার পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ৮.৫০ লক্ষ কোটি টাকায় নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি একটি অতি উচ্চাভিলাষী এমনকি অনেকটা বাস্তবতা বিবর্জিত পরিকল্পনা বলেই মনে হয়। কারণ, বাজেট যত বড় হয় তা বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আহরণের চাপও তত বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ এসে পড়ে সাধারণ জনগণের ওপর। নতুন কর, বাড়তি করহার এবং পরোক্ষ করের মাধ্যমে।যা থেকে বাদ পরে না সমাজের উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরের একজন ভিখারি পর্যন্ত।

আমাদের অর্থনীতির আরেকটি কঠিন বাস্তবতা হলো, বড় বাজেটের সঙ্গে প্রায়শই অপচয়, অদক্ষতা ও দুর্নীতির ঝুঁকি সমানতালে বাড়ে। বিশেষত উন্নয়ন বাজেট বা ADP বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রকল্প সংশোধনের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটের আকার ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা কমিয়ে ৬.৫০ লক্ষ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখা এবং ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় বাজেটকে উন্নয়নের সূচক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে। বড় বাজেট মানেই কার্যকর উন্নয়ন নয়। বরং অতিরিক্ত ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে সরকারকে ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক ঋণ এবং উচ্চ রাজস্ব আহরণের ওপর অধিক নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে সুদের হার বাড়ছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং শিল্প ও বিনিয়োগ খাত চাপে পড়ছে।

অন্যদিকে, করের আওতা ও হার বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। সামনে জ্বালানির দাম বাড়লে নতুন করে এর প্রভাব প্রতিটি পণ্যের দামে পড়বে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে আরও বড় দুর্ভোগ ডেকে আনবে।

এই পরিস্থিতিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) পুনর্মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, বারবার সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (RDPP) এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার প্রবনতা প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। অনেক ক্ষেত্রে একই প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয়েছে। এ অবস্থায় ADP থেকে অন্তত ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা কমিয়ে এনে গুণগত ব্যয়ের ওপর জোর দেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

বাস্তবতা বড়ই উদ্বেগজনক। রাজধানীতে একই সড়ক বারবার খোঁড়াখুঁড়ি। কখনো পানি, কখনো গ্যাস, কখনো টেলিযোগাযোগ সংস্থার কাজ সমন্বয়ের অভাবে একের পর এক অপচয় ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। প্রকল্পে ফ্যাক্টরিং ভিজিট ও ট্রেনিং এর নামে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রজেক্ট সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের জন্য দামি গাড়ির বরাদ্দ না থাকলে চূড়ান্ত পর্যায়ে এমন প্রকল্প নাকি আটকে যায়। সম্প্রতি, নতুন সচিবালয় নির্মাণ প্রকল্পে প্রতি বর্গফুটের নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কালন করা হয়েছে ৫৪ হাজার টাকা। এরূপ অস্বাভাবিক ব্যয় নির্ধারণ জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না; সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনাই মূল চাবিকাঠি।প্রতি অর্থবছরে বাংলাদেশের ১২০০ থেকে ১৩০০ প্রকল্প চলমান থাকে। এত অধিক পরিমাণ প্রকল্পের দেখভাল করে ব্যয় নিয়ন্ত্রন রাখা কষ্টসাধ্য।

গত ৭ বছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩,৪০,৬০৫ কোটি টাকা থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭,৬১,৭৮৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৭ বছরে বাজেট বেড়েছে প্রায় ৪,২১,১৮০ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ১২৪ শতাংশ এবং প্রতি বছর প্রতি বছর নিয়ম করে বৃদ্ধি ৬০ হাজার কোটি টাকা। কিন্ত প্রশ্ন হলো, এই বিপুল বাজেট বৃদ্ধির সমানুপাতিক সুফল কি সাধারণ মানুষ পেয়েছে?

মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা বলছে বাজেটের আকার যত বড় হয়েছে, জনগণের স্বস্তি ততটা বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অপচয়, প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

অতএব, এখন সময় এসেছে বাজেটের আকার নয় বরং ব্যয়ের দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণমুখী অগ্রাধিকারকে সামনে আনার। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, তথ্য-প্রযুক্তি এবং জরুরি অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ বা বিলাসী প্রকল্পগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা যেতে পারে। পাশাপাশিপ্রতিটি প্রকল্প গ্রহণের আগে কঠোর cost-benefit analysis বাধ্যতামূলক করা উচিত।

অপচয় কমানোর আরেকটি বড় সুফল হলো করের চাপ হ্রাস। সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রিত থাকলে নতুন কর আরোপ বা করহার বৃদ্ধির প্রয়োজন কমে যায়। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে যা অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা করে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সর্বোপরি, বর্তমান বাস্তবতায় একটি ছোট কিন্ত কার্যকর বাজেটই বাংলাদেশের জন্য টেকসই পথ হতে পারে। ADP-এর আকার যৌক্তিকভাবে কমিয়ে, অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করে এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতির ভারসাম্য পুনরুদ্ধার সম্ভব। এর মাধ্যমেই জনগণের ওপর নতুন করের বোঝা না চাপিয়ে একটি সত্যিকারের স্বস্তির বাজেট নিশ্চিত করা যেতে পারে।

আজ বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু বড় বাজেট ঘোষণা নয় বরং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এমন একটি বাজেট প্রয়োজন, যা কাগজে-কলমে উচ্চাভিলাষী নয়, বাস্তবে মানুষের জীবনে স্বস্তি বয়ে আনে। করের নতুন বোঝা চাপিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর পথ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে; এর পরিবর্তে অপচয়, অদক্ষতা ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ব্যয়ের প্রতিটি টাকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার। একটি সুশাসনভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী বাজেটই পারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে, বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাস্তব স্বস্তি নিশ্চিত করতে। এখন সময় এসেছে বাজেটের আকারের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গুণগত উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের।

লেখক : মোঃ আল আমিন ভূঁঞা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.