অস্বস্তির মধ্যে আছে ইউরোপ। জ্বালানি তেলের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই মহাদেশ সতর্ক। যুক্তরাজ্যের সরকার ভোটারদের শান্ত থেকে স্বাভাবিক জীবন চলমান রাখার বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের (ইইউ) নির্বাহী সংস্থা মানুষকে বেশি করে বাড়ি থেকে কাজ করার এবং ভ্রমণ কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিষয়টি নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ওপর। ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সমস্যা নতুন কিছু নয়। মাত্র কয়েক বছর আগে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরু করলে ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল।
এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু জ্বালানি স্বনির্ভরতা। পারমাণবিক বিদ্যুতের বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য উভয়ই মনে করছে, বিদ্যুতের উৎসের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎও রাখা দরকার। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, এ থেকে কত দ্রুত সমাধান পাওয়া যেতে পারে বা এটা কতটা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য।
সম্প্রতি প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় পারমাণবিক শক্তিবিষয়ক সম্মেলনে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন বলেন, ইউরোপের পারমাণবিক শক্তি থেকে মুখ ফেরানো ছিল কৌশলগত ভুল। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০১১ সালে জার্মান সরকার ধাপে ধাপে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯০ সালে ইউরোপের বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসত পারমাণবিক শক্তি থেকে। এখন তা গড়ে ১৫ শতাংশ। ফলে ইউরোপ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই জ্বালানির দাম যেমন বেশি, তেমনি এর বাজার অস্থিতিশীল।
ইউরোপ তার জ্বালানির অর্ধেকের বেশি আমদানি করে, মূলত তেল ও গ্যাস। ফলে অপ্রত্যাশিত সরবরাহ সংকট বা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি—দুটিই ঝুঁকির কারণ হয়ে ওঠে। যেমনটা রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের সময় হয়েছিল, যখন ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এখন আবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
গ্যাসের দাম ইউরোপে প্রায় সমান হারে বাড়লেও বিদ্যুতের দাম দেশে দেশে ভিন্ন হারে বাড়ছে। বিষয়টি নির্ভর করে কোন দেশ কোন উৎস থেকে কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তার ওপর। স্পেন বায়ু ও সৌরশক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, বছরের বাকি সময় সেখানে বিদ্যুতের গড় দাম ইতালির প্রায় অর্ধেক থাকবে। অন্যদিকে ফ্রান্সে যত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তার প্রায় ৬৫ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ।
২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর জার্মানি পারমাণবিক শক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে। ফলে জার্মান অর্থনীতি গ্যাসের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ সপ্তাহে বার্লিনের শীর্ষ অর্থনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো জার্মানির ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে।
বিষয়টি হলো স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে ইউরোপে পারমাণবিক শক্তির প্রতি নতুন করে উত্সাহ তৈরি হচ্ছে। পরমাণু শক্তির ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা বাতিলের জন্য খসড়া আইন তৈরি করছে ইতালি। বেলজিয়াম বছরের পর বছর পারমাণবিক শক্তিতে বিনিয়োগে অনীহা দেখিয়েছে। তারাও এখন পরিবর্তন আনছে। গ্রিস উন্নত রিঅ্যাক্টর ডিজাইন নিয়ে জনসাধারণের মতামত নিচ্ছে, কেননা, তারা ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে সতর্ক। সুইডেন চার দশকের পুরোনো পারমাণবিক প্রযুক্তি ত্যাগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস নতুন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শিথিল করেছেন।
রিভস বলেন, জাতীয় সহনশীলতা গড়ে তোলা, বিদ্যুতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তি প্রয়োজন।
ইউগভের নতুন জরিপে দেখা গেছে, স্কটল্যান্ডে পারমাণবিক শক্তির প্রতি সমর্থন বাড়ছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষ জ্বালানি সরবরাহের অংশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তিকে সমর্থন করছে।
ফ্রান্স স্পষ্টতই সবচেয়ে জোরালো পারমাণবিক সমর্থক। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখো পারমাণবিক শক্তিবিষয়ক সম্মেলনে বলেন, পারমাণবিক শক্তি হলো স্বাধীনতা পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো ও কার্বন নিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করার উপায়। তিনি আরও বলেন, এআই ও তথ্যকেন্দ্রের চাহিদা বাড়ছে; পারমাণবিক শক্তি ইউরোপকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে পারে।
কিন্তু পারমাণবিক শক্তি স্বল্পমেয়াদি সমাধান নয়। নতুন রিঅ্যাক্টর নির্মাণে বিলম্ব হতে পারে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগ এখনো আছে। পরিবেশবাদী ব্যক্তিরা সতর্ক করছেন, পারমাণবিক শক্তিতে বিনিয়োগ করা হলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে মনোযোগ আছে, তা কমে যেতে পারে। এ ছাড়া মধ্য ইউরোপের কয়েকটি দেশ এখনো রাশিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়ামের ওপর নির্ভরশীল।
চ্যাটহ্যাম হাউসের গবেষক ক্রিস আয়লেট বলেন, ইউরোপের পারমাণবিক ইতিহাস উপেক্ষা করলে মনে হতে পারে, এটি সহজ সমাধান। তবে অনেক রিঅ্যাক্টর পুরোনো হয়ে গেছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে নানা কারণেই বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করতে হবে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো এখন যা আছে, তা টিকিয়ে রাখা। এরপর যদি পারমাণবিক বিদ্যুতের হিস্যা বাড়াতে হয়, তাহলে অনেক সময় ও অর্থ প্রয়োজন।
কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো ঋণগ্রস্ত। সেই সঙ্গে তারা অর্থের স্বল্পতা ও নানাবিধ অগ্রাধিকার নিয়ে জর্জরিত, যেমন সামাজিক কল্যাণ বজায় রাখা ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি। অন্যদিকে বায়ু ও সৌরশক্তির খরচ কমার কারণে পারমাণবিক শক্তি পিছিয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) নিয়ে আগ্রহী। এই এসএমআর মডেল সবচেয়ে ব্যয় সাশ্রয়ী। এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো এবং হাইড্রোজেন ও স্থানীয় হিটিং নেটওয়ার্কের জন্য এই এসএমআর যথাযথ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি ৩৩ কোটি ইউরোর পারমাণবিক শক্তি বিনিয়োগ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্যাকেজ থেকে এসএমআরে বড় সমর্থন দেওয়া হবে। ব্রাসেলস আশা করছে, এই নতুন প্রযুক্তি ২০৩০-এর দশকের প্রথম দিকে কার্যকর করা যাবে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.