পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে কর–প্রণোদনা ও নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)। সংগঠনটি মনে করে, সঠিক কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দিলে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে আসবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বুধবার (১ এপ্রিল) জাতীয় বাজেটের জন্য দেওয়া নীতিপ্রস্তাবে পুঁজিবাজার উন্নয়নে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে বিএমবিএ।
বিএমবিএ বলছে, কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর ব্যবধান আরও বাড়ানো জরুরি। প্রস্তাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ১৮ শতাংশ নির্ধারণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য প্রথম পাঁচ বছর করহার ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আইপিও উৎসাহিত করতে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে বিশেষ কর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী তালিকাভুক্তির পর প্রথম তিন বছর ৫০ শতাংশ কর ছাড় এবং পরবর্তী দুই বছর ২৫ শতাংশ কর ছাড় দেওয়া যেতে পারে। তবে এ সুবিধা পেতে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শেয়ার সাধারণ মানুষের হাতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
দেশের বড় কর্পোরেট ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে “ডিমড টু বি লিস্টেড” নামে নতুন কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে বিএমবিএ। প্রস্তাব অনুযায়ী যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকার বেশি, অথবা বার্ষিক টার্নওভার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি, অথবা ব্যাংক ঋণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি তাদেরকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হবে। তালিকাভুক্ত হলে কর সুবিধা দেওয়া হবে, আর তালিকাভুক্ত না হলে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকেও তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় এক হাজার কোটি টাকার বেশি, তাদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ২০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। এই ক্ষেত্রে লভ্যাংশে উৎসে কর কমানো ও কর্পোরেট কর সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্যাপিটাল গেইন কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছে বিএমবিএ। বর্তমানে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত থাকলেও তা পুরোপুরি করমুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে কর্পোরেট বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল গেইন কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিএমবিএর প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করা এবং এর বেশি হলে উৎসে করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এতে একই আয়ের ওপর দ্বৈত কর আরোপ কমবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
বর্তমানে কোম্পানি লাভের ৭০ শতাংশ ধরে রাখলে ১০ শতাংশ কর দিতে হয়। এই নিয়ম বাতিলের প্রস্তাব করেছে বিএমবিএ। তাদের মতে, এতে কোম্পানির সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া স্টক ডিভিডেন্ড ক্যাশ ডিভিডেন্ডের বেশি হলে ১০ শতাংশ কর আরোপের নিয়ম বাতিলেরও দাবি জানানো হয়েছে।
বাজার মধ্যস্থতাকারী অর্থাৎ স্টক ব্রোকার, ডিলার ও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের মার্জিন ঋণের মন্দ ঋণকে করযোগ্য ব্যয় হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বাজার মধ্যস্থতাকারীদের আর্থিক চাপ কমবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
নিষ্ক্রিয় তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানি টানা তিন বছর বার্ষিক সাধারণ সভা করেনি ও লভ্যাংশ দেয়নি তাদের করহার অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির সমান করার প্রস্তাব দিয়েছে বিএমবিএ।
বিএমবিএ’র মতে, এসব প্রণোদনা বাস্তবায়ন করা হলে বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়বে ও বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি পুঁজিবাজার অর্থনীতির বড় অর্থায়ন উৎসে পরিণত হবে বলে মনে করে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের এই সংগঠনটি।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.