টেকসই নির্মাণে স্বল্প-কার্বন উপকরণ ব্যবহার অপরিহার্য: কর্মশালায় বক্তারা

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও দ্রুত নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আবাসন ও অফিস নির্মাণ খাতে স্বল্প-কার্বন উপকরণ ব্যবহার অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অবকাঠামো তৈরির নকশা থেকে শুরু করে ব্যবহার উপযোগী করার প্রতিটি পর্যায়ে আগের উপকরণ পুনঃব্যবহার, স্বল্প-কার্বন সামগ্রীর ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তারা।

রবিবার (২৯ মার্চ) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘সার্কুলারিটি ইন দ্য বিল্ট এনভায়রনমেন্ট’ শীর্ষক কর্মশালায় দেশের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হয়। কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্মাণ খাতে টেকসই ও সম্পদ-দক্ষ পদ্ধতির প্রচার এবং বাস্তবায়ন।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্মশালার আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করেছে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি, জাতিসংঘ প্রকল্প সেবাগুলোর কার্যালয় এবং জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি।

জার্মান ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের অধীনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য টেকসই নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের নির্মাণ পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

কর্মশালায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু সহনশীল নির্মাণ পদ্ধতি ত্বরান্বিত করতে আবর্তনশীল অর্থনীতির নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম বলেন, “নির্মাণ খাত দেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এটি সম্পদ-নিবিড় এবং পরিবেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা বাড়বে। প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্মাণ অব্যাহত থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়বে এবং বর্জ্য ও কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাবে।”

তিনি উল্লেখ করেন, দেশের সামনে টেকসই ও স্বল্প-কার্বন উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবর্তনশীল পদ্ধতি উপকরণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত, বর্জ্য হ্রাস এবং অবকাঠামোর স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি জানান, হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহায়তায় একটি জাতীয় গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন সিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর তাদের রেট শিডিউলে স্বল্প-কার্বন সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে কাজ করছে।

জার্মান দূতাবাসের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রধান উলরিখ ক্লেপমেন বলেন, “নির্মাণ খাত বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ, বর্জ্য উৎপাদন এবং সম্পদ ব্যবহারে বড় ভূমিকা রাখে। তাই আবর্তনশীল পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া পরিবেশগত প্রয়োজনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি করে।”

তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে শুধু সদিচ্ছা নয়, বরং অবকাঠামোর নকশা, নির্মাণ, ব্যবহার এবং পুনঃব্যবহার—সবক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।”

জাতিসংঘ প্রকল্প সেবাগুলোর কার্যালয়ের কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরলিধরন বলেন, “পুনঃব্যবহার বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য। এখন প্রয়োজন এই ধারণাকে আধুনিক নির্মাণ ব্যবস্থায় যুক্ত করা।”

তিনি আরও বলেন, “পুরোনো ভবনগুলো থেকে সৃষ্ট বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা না গেলে তা পরিবেশগত সমস্যায় পরিণত হবে। তবে এটি সংকট নয়, বরং একটি সুযোগ।”

কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার এবং হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দারসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা, শিক্ষক ও গবেষকরা।

বক্তারা টেকসই ও স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি খাত ও একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।

তারা বলেন, নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশগত চাপ হ্রাসে আবর্তনশীল পদ্ধতি একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে।

অনুষ্ঠানে টেকসই নির্মাণের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরা হয় এবং “বাংলাদেশের নির্মাণ পরিবেশে কীভাবে আবর্তনশীল অর্থনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়” শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.