৮ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৭১ হাজার কোটি টাকা, চাপে এনবিআর

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক–কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতিবছরের মতো শুল্ক–কর আদায়ের ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না এনবিআর। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন থেকে পিছিয়ে পড়ছে এনবিআর।

বাজেটের মাধ্যমে সরকারের খরচের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এনবিআরের হালনাগাদ তথ্য সূত্রে জানা গেছে, জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকার শুল্ক–কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল এনবিআরের। এ সময়ে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।

নতুন সরকারকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে চার মাসে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। সংশোধিত বাজেট অনুসারে, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ নানা কারণে এ বছর ব্যবসা–বাণিজ্যে শ্লথগতি ছিল। ভবিষ্যতেও এই সংকট চলমান থাকার শঙ্কা আছে। করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার করার কাজ করছে এনবিআর।

রাজস্ব বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত আছে। সংস্থাটি ৪৭০ কোটি টাকার ঋণের শর্ত হিসেবে প্রতিবছর জিডিপির আধা শতাংশের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের শর্ত দিয়েছে।

ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর—এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি।

গত জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে এনবিআর সব মিলিয়ে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা আদায় করেছে। লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। আট মাসে ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। তবে শুল্ক–কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ।

আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। আট মাসে ঘাটতি হয় ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এ খাতে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা।

আমদানি খাতে ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি হয়। এ সময় এ খাতে ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা।

গত জুলাই–ফেব্রুয়ারিতে ভ্যাট বা মূসক আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এ সময়ে এ খাতের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।

শেষ ৪ মাসে কী করতে হবে

মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত অর্থবছরের শেষ চার মাসে বিপুল পরিমাণ শুল্ক–কর আদায় করতে হবে। নতুন সরকারকে মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে প্রায় তিন লাখ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করতে হবে।

এত বিপুল অর্থ আদায় করা সহজ নয়। কারণ, চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই এত রাজস্ব আদায় হয়নি। গত জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা আদায় করেছে এনবিআর। আর এ বছরের সর্বনিম্ন রাজস্ব আদায় হয়েছে গত আগস্টে ২৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজস্ব খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে এনবিআরকে বিলুপ্ত করে রাজস্ব আদায় ও নীতি নিয়ে দুটি আলাদা বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশ অনুসারে এখনো দুটি বিভাগ হয়নি। এনবিআরের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পক্ষ থেকে একধরনের বাধা আছে। এ নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। নতুন সরকারকে এখন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

এ ছাড়া কর–জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, ঘুষ–দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া—এসব পুরোনো সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হতে হবে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.