দিয়েগো গার্সিয়া হামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি, ‘সাজানো’ বলছে ইরান

ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। তেহরান এ ঘটনাকে ইসরায়েলের ‘ফলস ফ্ল্যাগ অ্যাটাক’ বা সাজানো বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেন, এই অভিযোগগুলো মূলত পরিকল্পিত ‘ভুল তথ্যের’ অংশ। এর আগে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে জানিয়েছিলেন, হামলায় ইরানের আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে ইসরায়েল যে দাবি করেছে, তার সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি এই সামরিক জোট।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলার মধ্যে গত শুক্রবার দিয়েগো গার্সিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাটি চাউর হয়। দাবি করা হয়ে, ইরান এ হামলা চালিয়েছে। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ওঠে। কারণ, দ্বীপটি ইরান থেকে চার হাজার কিলোমিটার দূরে।

এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বাগাই লিখেছেন, ‘এমনকি ন্যাটোর মহাসচিবও ইসরায়েলের এই অতি সাম্প্রতিক ভুল তথ্যকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেছেন। অথচ তিনি জোটের সদস্যদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার এবং ইরানের ওপর এই অবৈধ যুদ্ধকে সমর্থন করার জন্য চাপ দেওয়ার বিষয়ে কুখ্যাত। তাঁর এ অবস্থানই অনেক বড় বার্তা দেয় যে বিশ্ব এখন এ ধরনের ভিত্তিহীন “ফলস ফ্ল্যাগ” বা সাজানো গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত।’

যদি এ হামলার পেছনে ইরানের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়, তাহলে এর অর্থ দাঁড়াবে, দেশটির কাছে চার হাজার কিলোমিটার বা এর বেশি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এই পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অনায়াসেই যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনেও আঘাত হানা সম্ভব।

রোববার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্ক রুতে ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর যুদ্ধকে সমর্থন করেন। এ যুদ্ধকে ‘প্রয়োজনীয়’ উল্লেখ করে তিনি সাধারণ মানুষের সমর্থনও কামনা করেন। রুতে বলেন, ‘আমি জনমত জরিপগুলো দেখেছি। তবু আমি সত্যিই আশা করি, আমেরিকানরা ট্রাম্পের পাশে থাকবেন। কারণ, তিনি পুরো বিশ্বকে নিরাপদ করার লক্ষ্যেই এই কাজ করছেন।’

এর আগে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম জানায়, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকালের মধ্যে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। তবে সেগুলো দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়।

তখনই আলোচনা উঠছিল, যদি এ হামলার পেছনে ইরানের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়, এর অর্থ দাঁড়াবে, দেশটির কাছে চার হাজার কিলোমিটার বা এর বেশি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এই পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অনায়াসেই যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনেও আঘাত হানা সম্ভব।

আমরা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ইচ্ছাকৃতভাবে দুই হাজার কিলোমিটারের নিচে সীমাবদ্ধ রেখেছি। কারণ, আমরা চাই না বিশ্বের কেউ আমাদের হুমকি হিসেবে মনে করুক।
আব্বাস আরাগচি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ইচ্ছাকৃতভাবে দুই হাজার কিলোমিটারের নিচে সীমাবদ্ধ রেখেছি। কারণ, আমরা চাই না, বিশ্বের কেউ আমাদের হুমকি মনে করুক।’

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি সোমবার জানান, দিয়েগো গার্সিয়ার অভিমুখে দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে হিলি বলেন, একটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর অনেক আগেই আছড়ে পড়ে এবং অন্যটিকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই ভূপাতিত করা হয়। তিনি এ হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং ইরানকে ‘উত্তেজনা প্রশমনের’ আহ্বান জানান।

জন হিলি আরও বলেন, ‘কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই দিয়েগো গার্সিয়ার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। এ জন্য যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি এবং সেখানে স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

ব্রিটিশ আবাসনমন্ত্রী স্টিভ রিড রোববার বলেন, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাজ্যে আঘাত হানার পরিকল্পনা করছে—এমন কোনো ইঙ্গিত তাঁদের কাছে নেই। এমনকি ইরান হামলা চালাতে চাইলেও তাদের সেই সক্ষমতা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কর্মী রয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই মার্কিন নাগরিক। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর হামলায় ঘাঁটিটি নিয়মিত মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা দিয়ে আসছে।

ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামির দাবি করেছেন, এই যৌথ ঘাঁটিতে হামলার জন্য ইরান ‘দুই স্তরের একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ ব্যবহার করেছে। এর পাল্লা প্রায় চার হাজার কিলোমিটার।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি বিশ্বের জন্য একটি বড় হুমকি। দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিয়ে আসছিল তেল আবিব।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রশাসনগুলো ইরানে সরাসরি সামরিক হামলার সেই চাপ বরাবরই উপেক্ষা করে আসছিল। এর পরিবর্তে তেহরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে জন্য দেশটির ওপর নানা ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন।

দিয়েগো গার্সিয়া বিশ্বজুড়ে মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটি লজিস্টিক ও হামলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। এ ঘাঁটিতেই যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বোমারু বিমান ও নজরদারি বিমানগুলো রাখা হয়।

প্রযুক্তিগতভাবে এ হামলায় লক্ষ্যভেদ হয়েছে কি না, তার চেয়েও রাজনৈতিকভাবে দিয়েগো গার্সিয়াকে হামলার সীমার মধ্যে দেখানোর বিষয়টিই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘এসএম-৩’ ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যদিও এর ফলাফল এখনো অস্পষ্ট।

ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, এ হামলা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের বিপরীতে ইরানের পাল্টা জবাবের গভীরতা প্রকাশ করে।

এলিজা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্র ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। আর এমনটা ঘটলে উত্তেজনার নিয়ন্ত্রণ, যা যুক্তরাষ্ট্র চায়, তা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, নতুন স্থাপনা, নতুন অবস্থান এখন ঝুঁকিতে পড়ছে।’

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.