যখন ঈদের চাঁদ উঠে, তখন অনেক পরিবারের মুখে হাসি ফোটে আনন্দে, কিন্তু কিছু পরিবারের চোখে থাকে শূন্যতা আর অভাবের ছায়া। এই শূন্যতা পূরণ করতে, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সবার পাশে আমরা ফাউন্ডেশন। এ বছর রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ১২১টি অসহায় পরিবারের দরজায় পৌঁছে দিয়েছে ঈদের বাজারের প্যাকেজ—এমনভাবে যাতে কোনো পরিবারের সম্মানে আঘাত না লাগে এবং তারা গোপনে এই সাহায্য গ্রহণ করে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
সংগঠনের অন্যতম প্রধান সংগঠক আবুল বাহার ফারাহ্ অর্থসূচকের সাথে আলাপকালে জানান, “বিগত ২০ বছর ধরে আমরা ‘তোমার খুশিতে আমার ঈদ’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে অসহায় পরিবারগুলোর সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু খাবার বা পোশাক দেওয়া নয়, বরং তাদের মনে করিয়ে দেওয়া যে তারা একা নন—সমাজের একটা অংশ তাদের পাশে আছে।”

ফারাহ্ আরও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সংগঠনের প্রধান উদ্যোক্তা মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ তুহিন এর কথা। তিনি বলেন, “এই সংগঠনের প্রধান উদ্যোক্তা হচ্ছে আমাদের বন্ধু মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ তুহিন। তার অনুপ্রেরণায় আমরা সবাই একত্রিত হয়েছি। তুহিনের দূরদর্শিতা, মানবতার প্রতি অটুট ভালোবাসা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমই আমাদের এই পথে এগিয়ে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তি। তার একটা স্বপ্ন থেকেই শুরু হয়েছে এই যাত্রা, আর আজ আমরা সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করে যাচ্ছি।”
এ বছরের কার্যক্রমে সংগঠনটি শুধু ঈদের বাজার বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রমজানের পুরো মাসজুড়ে মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইফতারের আয়োজন, মাদ্রাসার শিশুদের জন্য নতুন কিতাব, খাতা-কলম, অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ কেনা এবং ঈদের নতুন জামা-কাপড় প্রদান করা হয়েছে। এসব কাজের মাধ্যমে তারা শুধু শারীরিক চাহিদা পূরণ করেনি, বরং শিশুদের মানসিক বিকাশ ও শিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে।
একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য প্রকল্প হলো গত ৬ বছর ধরে চলমান সাবলম্বীকরণ কর্মসূচি। প্রতি বছর এক বা দুটি পরিবারকে বেছে নিয়ে তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাবলম্বিতার পথ দেখানো হয়। কোনো পরিবারকে ছোট ব্যবসার জন্য মূলধন দেওয়া হয়, কাউকে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, আবার কাউকে অন্য উপায়ে সহায়তা করা হয় যাতে তারা ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। ফারাহ্ জানান, এই প্রকল্পের ফলে ইতিমধ্যে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে এবং তারা এখন নিজেরাই অন্যদের সাহায্য করার চেষ্টা করে।
সংগঠনটি কোনো বড় প্রতিষ্ঠান বা ফান্ডের ওপর নির্ভর করে না। এটি চলে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। মূল সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ তুহিন, আবুল বাহার ফারাহ্, মুহাম্মদ তৌকির আহমদ, শামীমা আক্তার নিম্মি, কাউসার আহমদ হুমায়ুন, মেহেদী হাসান লিয়ন, সাবাহ শারীকসহ আরও অনেকে। তারা বছরের প্রতিটি দিনই বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত থাকেন—রমজান-ঈদের বাইরেও বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য যেকোনো দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান।
সংগঠনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে ফারাহ্ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই একটি এমন এতিমখানা গড়ে তুলতে যেখানে প্রতিটি অসহায় শিশু নিজের বাড়ি মনে করবে। সেখানে তারা শুধু খাবার-পরিধান পাবে না, পাবে ভালোবাসা, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং একটা নিরাপদ ভবিষ্যৎ। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য আমরা ধীরে ধীরে এগোচ্ছি, আর সমাজের সকলের সহযোগিতা চাই।”
সবার পাশে আমরা ফাউন্ডেশনের এই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, মানবতার জয়গান গাওয়া যায় ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমেও। একদল বন্ধুর আন্তরিকতা ও একতা দিয়ে সমাজের একটা অংশকে আলোকিত করা সম্ভব। তাদের এই প্রচেষ্টা শুধু ঈদের দিন নয়, সারা বছর ধরে অসহায় মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে। ফারাহ্ শেষ কথায় বলেন, “আমাদের এই পথচলা একা নয়। সমাজের প্রতিটি সদস্য যদি একটু একটু করে এগিয়ে আসে, তাহলে আমরা একসাথে একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।”



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.