দশকব্যাপী পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান যে ‘ছায়া ট্যাঙ্কার’ (শ্যাডো ফ্লিট) বহর তৈরি করেছিল, এখন সেই লড়াকু কৌশলের কাছেই নতিস্বীকার করতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরান এমন এক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে পশ্চিমা সম্পৃক্ততা থাকা জাহাজগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ইরানের নিজস্ব জাহাজগুলো অনায়াসেই এই পথে চলাচল করছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ইরান ও রাশিয়ার মতো শত্রুদের দমাতে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, ইরান সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পারস্য উপসাগরে অন্তত ১৭টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। ফলে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে চাওয়া পশ্চিমা মালিকানাধীন জাহাজগুলোর বিমা প্রিমিয়াম এখন আকাশচুম্বী।
অ্যানালিটিকস ফার্ম কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এই জলপথে যান চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২০টিরও বেশি দূরপাল্লার ট্যাঙ্কার নিরাপদে প্রণালি পার হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি জাহাজ সরাসরি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে অথবা ইরানের সেই বিখ্যাত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ।
কর্নল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক এবং ‘দ্য ইকোনমিক ওয়েপন: দ্য রাইজ অব স্যাংশনস অ্যাজ এ টুল অব মডার্ন ওয়ার’-এর লেখক নিকোলাস মুল্ডার বলেন, “দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় ইরান এমন এক প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক অস্ত্র অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার নেতিবাচক প্রভাব থেকে তাদের রক্ষা করছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞাই ইরানকে এ যুদ্ধের ধাক্কা থেকে কৃত্রিমভাবে সুরক্ষিত রেখেছে। ইরানের এ ছায়া ট্যাঙ্কার বহর পশ্চিমা বিমার ওপর নির্ভর করে না।”
ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স ডটকমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সমীর মাদানি জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান দৈনিক ১০ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করতে সক্ষম হয়েছে, যার সিংহভাগই গেছে চীনে। গত বছর এ গড় ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল। কেপলারের শিপিং বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ রাইট বলেন, যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের রফতানি সক্ষমতা অটুট ছিল। অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে ইরান বেশি অপরিশোধিত তেল সরাতে পারছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কাটা গায়ে নুনের ছিটা’র মতো।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরানের এ ছায়া বহর পূর্ণ শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের বিকল্প পথ তৈরি হচ্ছে। বেলজিয়ামভিত্তিক সুইফট বা পশ্চিমা বিমা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে চীন ও রাশিয়া এখন ইউয়ান ও রুবলের মাধ্যমে লেনদেন করছে। এমনকি, ইরান চীনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাম পরিশোধ করেছে তেলের মাধ্যমে।
রিস্ক ইন্টেলিজেন্সের সিনিয়র অ্যানালিস্ট ডার্ক সিবলস বলেন, “নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। ইরানের তেল চীনে নেওয়াটা অবৈধ কিছু নয়, এটি কেবল পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য আইনি বাধা।”
ম্যারিন অ্যানালিস্টদের মতে, ইরান এখন ইয়েমেনের হুথিদের রণকৌশল অবলম্বন করছে। লোহিত সাগরে হুথিরা যেভাবে বাছাই করে পশ্চিমা জাহাজ লক্ষ্যবস্তু বানাত এবং চীন-রাশিয়ার জাহাজকে নিরাপদ পথ দিতো, ইরান এখন হরমুজ প্রণালিতে তার চেয়েও উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে সেই মডেল অনুসরণ করছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজ করাচি (লোরাক্স) এবং ভারতের দুটি এলপিজি ট্যাঙ্কার ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদে প্রণালি পার হয়েছে। শিপিং অ্যানালিস্ট মিশেল উইস বকম্যান বলেন, “ইরান হুথিদের পরিকল্পনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। তারা পশ্চিমা সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে এলাকা থেকে দূরে রাখতে সফল হচ্ছে।”
হরমুজ প্রণালির এ অচলাবস্থা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ন্যাটো মিত্রদের কাছে সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ঝাড়ছেন, অন্যদিকে এ জলপথ পাহারার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তিনি বলেন, “আমরা কেন হরমুজ প্রণালি পাহারা দিচ্ছি যখন এটি মূলত চীন ও অন্যান্য দেশের কাজে লাগছে? তারা কেন এটা করছে না?”
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচুর তেল আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারিত হয় বিশ্ববাজারের ওপর ভিত্তি করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক পরাগ খান্না বলেন, “পাকিস্তান ও ভারত যেভাবে ইরানের সঙ্গে সরাসরি রফা করে জাহাজ পার করছে, তা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যাদের বোমা মারতে চায়, তাদের মাধ্যমেই বিশ্ব বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে দাবি তারা করতো, তা এখন ধূলিসাৎ।”
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.