ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump মার্কিন নাগরিকদের সমর্থন পাননি; বরং যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ অত্যন্ত অজনপ্রিয়। সেই সঙ্গে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতির প্রায় সব খাতে তার প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের ফল যা–ই হোক না কেন, এই অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। খবর গণমাধ্যম।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো আত্মবিশ্বাসী। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট Nicolás Maduro–কে আটক করার ঘটনাকে তিনি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, এতে শুধু ভেনেজুয়েলার তেল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণই আসেনি; একই সঙ্গে কিউবার সরকারের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। তাদের জ্বালানির উৎস সীমিত হয়ে গেছে। এর ফলে ১৯৫৯ সাল থেকে যে ছোট্ট কিউবা ওয়াশিংটনের গলার কাঁটার মতো হয়ে আছে, তাকে দুর্বল করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে Israel–এর সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প একই ধরনের সাফল্যের প্রত্যাশা করছেন। ইসরায়েল তো বটেই, যেসব আরব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আছে, সেই সব প্রতিবেশীদের দিকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করলেও ট্রাম্পের অবস্থান বদলায়নি। তিনি মনে করেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র জিতবে, যদিও ‘জয়’ বলতে তিনি কী বোঝেন, তা স্পষ্ট নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হয়ে গেলে স্বল্প মেয়াদে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে। তাঁর ভাষায়, এখন যে দাম বেড়ে গেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য ‘খুবই সামান্য মূল্য’। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি এভাবেই দেখা উচিত। যাঁরা এভাবে দেখেন না, তাঁরা বোকা।
ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসের আরেকটি কারণ হলো, এখন পর্যন্ত তিনি নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যা করেছেন, তাতে তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। উচ্চ শুল্ক আরোপ, ফেডারেল কর্মসংস্থান কমানো, অভিবাসী শ্রমিকদের বহিষ্কার, Federal Reserve–এর ওপর অব্যাহত আক্রমণ—এসবের ফলে যে বড় সমস্যা হয়েছে, তা নয়। কয়েক সপ্তাহ আগেও অনেক অর্থনীতিবিদ ভাবছিলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবল থেকে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অনেকটা স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।
জ্বালানির দাম বাড়লেও উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে United States তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত। ২০০০ সালের শুরু থেকে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। তাদের দেশের বাজারে এই গ্যাসের দাম বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে অতটা সংগতিপূর্ণ নয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৩৮ শতাংশ হচ্ছে তেল। ১৯৭৩ সালের তেলসংকটের সময় এই হার ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা পুরোপুরি এড়ানো যায় না। ইরান Strait of Hormuz–এ চাপ সৃষ্টি করায় ইউরোপীয় বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। আবার Qatar তরলীকৃত গ্যাস স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়ায় বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের পছন্দের শেয়ারসূচক S&P 500 এখনো প্রায় সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি ছিল। ট্রাম্প মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শক্তিমত্তার প্রতীক হচ্ছে এই সূচক।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামরিক নয়, রাজনৈতিক। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, মার্কিন সামরিক অভিযানের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনগণের বিরোধিতা। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুদ্ধের যে উচ্চ ব্যয়, তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ। জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। তেলের দাম নির্ধারিত হয় বৈশ্বিক বাজারে—তা সে টেক্সাস থেকে আসুক বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে—ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যা সর্বোচ্চ। সরকারের পূর্বাভাস, খুচরা পেট্রলের দাম ২০২৫ সালের স্তরে ফিরতে ২০২৭ সালের শরৎ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ডিজেলের দামও অন্তত আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধপূর্ব দামের চেয়ে বেশি থাকবে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও কৃষি খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বলা বাহুল্য, পরিবহন কোম্পানিগুলো বাড়তি ব্যয় গ্রাহকদের ওপর চাপাবে। জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যের দামও বাড়বে। জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধিতে খুচরা ব্যবসা ও বিমান পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে এসবের প্রভাব দ্রুতই দেখা যাবে। ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে মার্চ থেকেই তা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা আছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার কমানোর পরিকল্পনাও ব্যাহত হতে পারে। পাম্পে জ্বালানির দাম বাড়লে আমেরিকানদের জনপ্রিয় এসইউভি গাড়ির বিক্রিও কমতে পারে।
এ সবকিছুর ফল হলো ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চিড় ধরতে পারে। পরিস্থিতি বুঝেই তেলের দাম কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে বিমা ও সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে তারা। Russia–এর কিছু তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর উপায়ও বিবেচনা করা হচ্ছে। লক্ষ্য—সম্ভাব্য সরবরাহ–ঘাটতি পূরণ করা।
কিন্তু তেলের দামের এই উল্লম্ফন ঠেকাতে এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বাস্তবে তেলের দাম স্থিতিশীল করতে হলে হয় যুদ্ধ শেষ করতে হবে, নয়তো ইরানের সামরিক সক্ষমতা এমনভাবে ধ্বংস করতে হবে, যাতে দেশটি আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে হুমকি দিতে না পারে।
মন্দার শঙ্কা
বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বৈশ্বিক তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ–বাধা তৈরি করছে।
Energy Policy Institute at the University of Chicago–এর পরিচালক স্যাম ওরি আল–জাজিরাকে বলেন, অতীতে তেলের দাম যখন জিডিপির প্রায় ৪-৫ শতাংশের সমান হয়ে দীর্ঘ সময় বাড়তি ছিল, তেমন বাস্তবতায় সব সময়ই মন্দা হয়েছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে যদি তেলের দাম বছরের বেশির ভাগ সময় প্রতি ব্যারেল প্রায় ১৪০ ডলারের কাছাকাছি থাকে, তাহলে মন্দার ঝুঁকি তৈরি হবে। যদিও বাস্তবতা ১৯৭০-এর দশকের মতো হবে না। কেননা, তারা এখন বিদেশি তেলের ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল।
তবে হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। ওরির সতর্কবার্তা, সংঘাত এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তেল বিক্রি করতে না পারায় অনেক দেশের সংরক্ষণাগার ভরে গেছে। এর ফলে তারা তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিতে শুরু করেছে।
ওরির মতে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, হরমুজ প্রণালিতে যদি মাইন পুঁতে দেওয়া হয় বা কোনো ধরনের কাঠামোগত বাধা সৃষ্টি করা হয়। অথবা যুদ্ধ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে হরমুজ কত দিন বন্ধ থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের দ্বৈত আচরণ
গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্যে একধরনের দ্বৈততা দেখা যায়। একদিকে তিনি তেহরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করছেন, অন্যদিকে বলছেন, যুদ্ধ প্রায় শেষ। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ করে কোনো দেশকে ধ্বংস করা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ জেতা সহজ নয়।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড সহজে অস্ত্র ত্যাগ করবে না, যদিও অনেক ইরানি তাদের অপছন্দ করে। অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হলেও এখনো হাজার হাজার সশস্ত্র যোদ্ধা আছেন, যাঁরা পাল্টা লড়াই চালিয়ে তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে পারেন। ট্রাম্প মুখে যতই বলুন না কেন, এই যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হওয়ার লক্ষণ আপাতত নেই।
এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তখন ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পারবেন, মাদুরোকে আটক করা যত সহজই হোক না কেন, সবখানে প্রতিপক্ষের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল যে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.