সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের নব-নির্বাচিত সরকার। এসব অধ্যাদেশের সাংবিধানিক বৈধতা, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠেছে।
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেছেন, ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হলেও তার কার্যালয়ের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং অসাংবিধানিকভাবে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকলে, সে সময়ে জারি করা যেকোনো অধ্যাদেশ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন করতে হয়। তা না হলে অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়।
১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ শুরু হওয়ার কথা। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সব ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হবে। সংসদ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবেন, এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হবে, সংশোধন করা হবে, নাকি বাতিল করা হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাড়াহুড়ো করে জারি করা অধ্যাদেশ “জরুরি প্রয়োজন” পরীক্ষায় টিকতে নাও পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জারি করা ১২২টি অধ্যাদেশের মধ্যে মাত্র ৫৪টি পরে সংসদে অনুমোদন পায়।
সবচেয়ে আলোচিত অধ্যাদেশগুলোর একটি হলো ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫। এতে ই-সিগারেট, ভ্যাপ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্য নিষিদ্ধ করা, তামাকের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা, পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করা, নির্ধারিত স্মোকিং জোন তুলে দেওয়া, দোকানে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা এবং প্যাকেটে বড় স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করার মতো পরিবর্তন আনা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা অধ্যাদেশকে স্বাগত জানালেও জারির প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এটি জারি করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ১ মার্চ হাইকোর্ট ই-সিগারেট আমদানি জব্দের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে এবং অধ্যাদেশের ধারা ৬(গ) নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলেছে। আদালত সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন, কেন ধারা বাতিল করা হবে না। আবেদনকারীরা যুক্তি দেন, ভ্যাপকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু প্রচলিত সিগারেট বৈধ রাখা হয়েছে, যা সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশের বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত।
অন্যদিকে, অধ্যাদেশ জারির সময় দেশের আর্থিক অবস্থা চাপের মধ্যে ছিল। সিগারেটের ওপর কর থাকলেও অবৈধ সিগারেটের বাজার বৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের রাজস্বে ক্ষতি হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারের প্রায় ১৩.১ শতাংশই অবৈধ সিগারেট এবং বছরে প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানো হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা আরও বেশি ক্রেতাকে অবৈধ বাজারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মাত্র ৬.৬ শতাংশে নেমেছে, যা এশিয়ার মধ্যে কম। নতুন সরকার কর-জিডিপি ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রেখেছে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও রাজস্ব স্থিতিশীলতা একসাথে অর্জন করতে হলে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। নতুন সরকারের উচিত, অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো অধ্যাদেশ অনুমোদনের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা। সব অধ্যাদেশ স্বচ্ছ ও পরামর্শভিত্তিক পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করলে আইনের শাসন শক্তিশালী হবে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.