প্রায় ছয় বছর ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল বিক্রয় বিভাগে কাজ করছেন শাহিদা খানম। এই সময়ে সংসার সামলানোর পাশাপাশি ব্যাংকের বিভিন্ন পণ্য ও সেবা বিক্রয়ের কাজগুলো রপ্ত করেছেন দক্ষতার সঙ্গে নিজেকে নিয়ে গেছেন সেরা পারফর্মারদের তালিকায়।
শাহিদা বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নে আলাদা মনোযোগ দেয়। ফলে পারফরম্যান্সও ভালো হয়।
ব্যাংকটির আরেক বিক্রয় কর্মকর্তা কনিকা আক্তারের মতে, নারীদের প্রচেষ্টার পাশাপাশি ব্র্যাক ব্যাংকের পজিটিভ ব্র্যান্ড ইমেজ তাদের কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছে। গ্রাহকেরা ব্র্যাক ব্যাংককে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে মনে করেন। ফলে তাঁদের কাছে গিয়ে আমাদের কখনো ব্যাংকের বিষয়ে আলাদা করে কিছু বলতে হয় না।
শাহিদা ও কনিকার মতো অন্তত ২০০ নারী কর্মকর্তা কাজ করছেন ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল ও এসএমই ডিভিশনের অধীনে বিক্রয় বিভাগে।
ব্যাংকটি জানিয়েছে, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সেলস টিম পরিচালনা করছে ব্র্যাক ব্যাংক।
ব্র্যাক ব্যাংকের নারী কর্মীরা ভালো পারফর্ম করার নেপথ্যে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাকেই সামনে এনেছেন।
ব্র্যাক ব্যাংকে টানা ১২ বছর ধরে কর্মরত এসএমই বিভাগের ঊর্ধ্বতন বিক্রয় কর্মকর্তা উম্মে হাবিবার মতে নারী কর্মীরা আকর্ষণীয় বেতনের চাইতে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা ও সহযোগিতার মনোভাবকে বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, এসএমই বিভাগে যোগ দেওয়ার একমাস পরই আমাকে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে চলে যেতে হয়েছিল। তখন আমার সিনিয়ররা খুব সাপোর্ট করেছেন, সবাই বিষয়টিকে সহজভাবে নিয়েছিলেন। এটি আমার মধ্যে একটা ভালো লাগা তৈরি করেছিল। এছাড়া ব্যাংকের নিজস্ব ডে-কেয়ার সুবিধা থাকায় ছুটি শেষে নির্বিঘ্নে অফিসের কাজ করার পাশাপাশি মায়ের দায়িত্বও পালন করতে পেরেছি, যা আমাকে খুব স্বস্তি দিয়েছিল।
ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মীদের নিয়মিত ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয় উল্লেখ করে হাবিবা বলেন, সহকর্মীদের কাছে থেকে আমরা নিয়মিত কাজের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পাই, এটা আমাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া এখানে আমরা কাজ করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পাই, ফলে কাজটাকে বোঝা মনে হয় না।
রিটেইল বিক্রয় বিভাগের কর্মকর্তা জেবিন আক্তার মৌসুমী বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টে অনেক এগিয়ে থাকায় আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের বিভিন্ন সেবা ডিজিটালি দিতে পারি। ফলে শারীরিক পরিশ্রম করার সক্ষমতার ক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান কমে আসে, যা আমাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
একই বিভাগের আরেক কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস মনে করেন, ব্র্যাক ব্যাংকের সব বিভাগের কর্মীদের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব নারীদের ভালো করতে উৎসাহ দেয়। আমাদের ব্যাংকে কোনো বিভাগের কাছে সহায়তা চাওয়ার দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নারী টিমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে উদ্বুদ্ধ করেন। ফলে এখানে আমাদের কমফোর্ট জোনটা অনেক বড় হয়, যার প্রভাব পড়ে পারফরম্যান্সে।
নারী সহকর্মীদের ভালো পারফরম্যান্সের জন্য তাঁদের কাজের প্রতি একাগ্রতা ও প্রতিনয়ত দক্ষতা বাড়ানোর স্পৃহাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন ব্র্যাক ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান মাহীয়ুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্র্যাক ব্যাংকে নারীদের ভালো পারফরম্যান্সের পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর একটি হলো, নারী কর্মীদের অনেকেরই বাসায় ফিরে সন্তানদের আলাদা করে যত্ন নেওয়ার তাগিদ থাকায় তাদের লক্ষ্য থাকে অফিস সময়ের মধ্যেই নিজেদের কাজগুলোকে শেষ করার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করায় এর প্রভাব সামগ্রিক পারফরম্যান্সে পড়ে। আর ব্যাংকও নারী কর্মীদের আলাদা করে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেয় না। এছাড়া নারীদের মধ্যে আমরা কাজ গুছিয়ে করার প্রবণতাও দেখেছি।
অফিসে যাওয়া-আসার সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্র্যাক ব্যাংক নারী কর্মীদের পরিবহন সুবিধা দেয় উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, নারীদের উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে ব্র্যাক ব্যাংক সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। ব্যাংকের পক্ষ থেকে নারীদের জন্য ‘তারা ফোরাম’ নামে একটা আলাদা প্ল্যাটফর্মও করা হয়েছে, যেখানে নারীরা তাদের যেকোনো সমস্যা বা অভিযোগ জানাতে পারেন।
ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসএমই ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, নারীদের যোগাযোগ দক্ষতা অনেক ভালো। তাঁরা গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার পাশাপাশি কাস্টমারের আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা গ্রাহকদের আর্থিক বিনিয়োগ ও পরিচালনা বিষয়ের পরামর্শক হয়ে যান। তারা নানাবিধ ব্যাংকিং সার্ভিসের মাধ্যমে কাস্টমারের ব্যক্তিগত,পারিবারিক এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজন অথবা সমস্যার সমাধান করতে পারেন, যা তাঁদের পারফরম্যান্স ভালো করতে ভূমিকা রাখে।
মোমেনের মতে নারীদের মধ্যে নতুন দক্ষতা অর্জনে বা পুরোনো দক্ষতাকে আরও ঝালাই করে নিতে প্রশিক্ষণের প্রতি বিশেষ নজর দিতে দেখা যায়। ফলে ব্র্যাক ব্যাংকের নারীরা দ্রুত দক্ষ হয়ে ওঠেন, যার প্রভাব পড়ে তাঁদের পারফরম্যান্সে।
নারী সহকর্মীদের আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয় মন্তব্য করে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময়েই আমাদের লক্ষ্য ছিল দেশের নারীদের দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করা। সেই ধারাবাহিকতাতেই আমরা বিক্রয় বিভাগে নারীদের প্রাধান্য দিয়েছি। একই সঙ্গে আমরা নারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যথাযথ প্রশিক্ষণ ও আন্তরিক সহায়তা দিয়েছি। এসব কারণে এখন আমাদের এই টিমের নারীরা ভালো ফলাফল নিয়ে আসছেন। ভবিষ্যতে আরও বেশি নারী কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।
উল্লেখ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের অর্থায়নে অগ্রাধিকার দেয়ার ভিশন নিয়ে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। যা এখন পর্যন্ত দেশের অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী একটি ব্যাংক। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ‘BRACBANK’ প্রতীকে ব্যাংকটির শেয়ার লেনদেন হয়। ৩১০টি শাখা ও উপশাখা, ৩৩০টি এটিএম, ৪৪৬টি এসএমই ইউনিট অফিস, ১,১১৭টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং দশ হাজারেরও বেশি মানুষের বিশাল কর্মীবাহিনী নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক কর্পোরেট ও রিটেইল সেগমেন্টেও সার্ভিস দিয়ে আসছে। ব্যাংকটি দৃঢ় ও শক্তিশালী আর্থিক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে এখন সকল প্রধান প্রধান মাপকাঠিতেই ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে অবস্থান করছে। বিশ লাখেরও বেশি গ্রাহক নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক বিগত ২৪ বছরেই দেশের সবচেয়ে বৃহৎ জামানতবিহীন এসএমই অর্থায়নকারী ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নিয়মানুবর্তিতায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.