অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে দেশের পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনেয়োগকারী ঐক্য পরিষদ (বিসিআইএ)। সংস্থাটির দাবি, বাজারে আস্থাহীনতা ও অস্থিরতার কারণে গত এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে নিট প্রায় ২৭০ কোটি টাকা প্রত্যাহার করেছেন।
সোমবার (৯ মার্চ) বিসিআইএ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, সংগঠনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছে তাদের পর্যবেক্ষণ ও বাজার নিয়ে করণীয় সম্পর্কিত লিখিত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল হক।
বিসিআইএ মনে করছে, একটি উদীয়মান ও সীমান্তবর্তী বাজার হিসেবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা কারণে বাজারটি প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না। বিশেষ করে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব পুঁজিবাজারকে বিপরীতমুখী ধারায় ঠেলে দিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে দুর্বল সুশাসন ও আর্থিক অনিয়মের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষকের মত। এর সঙ্গে ২০২৪ সালে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ফলে গত এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে নিট প্রায় ২৭০ কোটি টাকা প্রত্যাহার করেছেন। বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে অস্থিরতা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রধান কারণ হলো মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো শেয়ারের ঘাটতি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বিশ্বে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স করা বাজারগুলোর তালিকায় স্থান পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং সমন্বয়হীন নীতির কারণে বাজারের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত মানসম্পন্ন বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানির শেয়ার বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেয়, তবে বিদেশি তহবিল নতুন করে বাংলাদেশের বাজারে আগ্রহী হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান ও সীমান্তবর্তী বাজারের দিকে ঝুঁকছেন—যা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিক সময় ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা গেলে বিদেশি ও দেশীয় বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ৬ থেকে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের পুঁজিবাজারকে টেকসই, গতিশীল ও আধুনিক বাজারে রূপান্তর করা সম্ভব।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপ
১. বহুজাতিক ও লাভজনক দেশীয় কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা
বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে লাভজনক বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক করার আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।
২. দয়া-ভিত্তিক তহবিলের সংস্কৃতি বন্ধ করা
শেয়ারবাজারে সংকট দেখা দিলেই বড় অঙ্কের তহবিল গঠনের মাধ্যমে কৃত্রিম সহায়তা দেওয়া বন্ধ করা উচিত। বরং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বাজারকে নিজস্ব শক্তিতে এগিয়ে যেতে দেওয়া প্রয়োজন।
৩. জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
প্রতি বছর বাজেট অধিবেশনের সময় সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
৪. বড় মূলধন সংগ্রহে পুঁজিবাজারের ব্যবহার বৃদ্ধি
কোনো কোম্পানি যদি বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহ করতে চায়, তাহলে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়া উচিত।
৫. আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৬. লেনদেন ব্যবস্থায় সংস্কার
শেয়ার লেনদেনের কিছু বিদ্যমান পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করে বাজারকে আরও স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
৭. বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রকল্পের তালিকাভুক্তি
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে বাজারে নতুন গতি আসতে পারে।
৮. বড় বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিকে বাজারে আনা
নেসলে বাংলাদেশ, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, মেটলাইফসহ বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বাজারের গভীরতা বাড়বে।
৯. যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পেশাদার, অভিজ্ঞ ও আর্থিকভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করা প্রয়োজন।
১০. অপ্রয়োজনীয় নতুন বিধি জারি কমানো
বর্তমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অতিরিক্ত নতুন বিধি জারি করার প্রয়োজন কমে যাবে।
উপরোক্ত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অচিরেই আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান নিতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
অর্থসূচক/ এএকে



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.