রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না: গভর্নর

কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এ ছাড়া কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ঋণ প্রদান বা সুশাসন বিষয়ে কোনোরকম রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হলে তা সরাসরি তাঁকে জানানোর জন্য এমডিদের পরামর্শ দেন তিনি।

গভর্নর বলেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনসহ ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আজ রোববার ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সঙ্গে এক সভায় তিনি এ বার্তা দিয়েছেন।

সভায় এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংক-এর এমডি মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বে মোট ১৯টি ব্যাংকের এমডি যোগ দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে গভর্নর ছাড়াও তিন ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, হাবিবুর রহমান ও কবির আহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, গভর্নর ব্যাংক কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, চলমান সংস্কারপ্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সরকারের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে অফিসভাড়ার একটি কাঠামো ঠিক করে দেওয়া হবে, যাতে ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি অনুমোদনের জন্য বারবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে না হয়।

সভার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন এবিবি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘নতুন গভর্নরের সঙ্গে প্রথম বৈঠকটি সফল হয়েছে। গভর্নর অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। তিনি আমাদের ১৯ জনের প্রত্যেকের মতামত ধৈর্য ধরে একে একে শুনেছেন এবং তাঁর বেশ কিছু মূল অগ্রাধিকারের রূপরেখা তুলে ধরেছেন।’

মাসরুর আরেফিন জানান, গভর্নর এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যবসা ও উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি খেলাপি ঋণ থেকে সৃষ্ট অকার্যকর সম্পদগুলোর উৎপাদনশীল ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, কীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো নতুন উৎপাদন বা সেবাধর্মী উদ্যোগের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন।

সভায় গভর্নর ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগের বিষয়ে কথা বলেছেন। যেমন কীভাবে ব্যাংকগুলো অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনিরকে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে সাহায্য করা যায়। এভাবে জেলাওয়ারি ও গ্রামওয়ারি অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও সহায়তা করা সম্ভব।

মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘এসএমই অর্থায়নের গুরুত্ব ও পুনঃ অর্থায়ন প্যাকেজের মাধ্যমে এসএমই খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারাবাহিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছি।’

এবিবি চেয়ারম্যান জানান, সভায় গভর্নর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—১. তিনি কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না। ঋণ প্রদান বা সুশাসন বিষয়ে এমডিরা যদি কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হন, তাহলে তা সরাসরি তাঁকে জানানো। ২. এবিবির উত্থাপিত সমস্যাগুলোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। ব্যবসার খরচ কমানোর লক্ষ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ৩. সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠনসহ ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। ৪. কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ক্রমে কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হবে, যার শুরু হবে ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত নীতিমালার অধীন স্বাধীনভাবে ভাড়া এবং লিজিং চুক্তি করার অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে। ৫. রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে আটকে থাকা অর্থ এবং রেমিট্যান্স প্রণোদনার বকেয়া অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা পেশাদার এবং আমরা চাই গভর্নর সফল হোক। তিনি ব্যাংকের এমডিদের প্রধান অংশীজন হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ ছাড়া আমাদের বিদেশি প্রতিনিধি ও ঋণদাতাদের জন্য চলতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগে একটি “বাংলাদেশ ডে” আয়োজনের যে ধারণা তিনি দিয়েছেন, আমরা তার প্রশংসা করেছি।’

সভায় এমডিদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাইম ব্যাংকের হাসান ও. রশীদ, পূবালী ব্যাংকের মোহাম্মদ আলী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ, ট্রাস্ট ব্যাংকের আহসান জামান চৌধুরী, এনআরবি ব্যাংকের তারেক রিয়াজ খান, যমুনা ব্যাংকের মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ, ইস্টার্ন ব্যাংকের আলী রেজা ইফতেখার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যাংক এশিয়ার সোহেল আর কে হোসেন, ইসলামী ব্যাংকের মো. ওমর ফারুক খান।

এমডিদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতিউল হাসান, ব্র্যাক ব্যাংকের তারেক রেফাত উল্লাহ খান, মেঘনা ব্যাংকের সৈয়দ মিজানুর রহমান, এনসিসি ব্যাংকের শামসুল আরেফিন, ওয়ান ব্যাংকের মুহিত রহমান, মধুমতি ব্যাংকের মো. শফিউল আজম ও উত্তরা ব্যাংকের মো. আবুল হাশেম।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ১০ দিনের মাথায় গত বুধবার আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতাচ্যুত হয়, তখন ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি ছিল খুবই খারাপ। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। তাঁর দেড় বছরের মেয়াদে ব্যাংক খাতে ডলার ও টাকার সংকট অনেকটা কেটেছে। এ ছাড়া সংকটে থাকা পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগের পাশাপাশি নানা সংস্কার শুরু করা হয়। নতুন গভর্নর সেই সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এমডিদের।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.