সংবাদ সম্মেলন করে গভর্নরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করা বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তিন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।
বদলি হওয়া তিন কর্মকর্তা হলেন– নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ।
তাদের মধ্যে নওশাদ মোস্তফাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে বরিশাল অফিস, মাসুম বিল্লাহকে রংপুর ও গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া অফিসে বদলি করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগসহ একাধিক ইস্যুতে প্রশ্ন তোলেন। এ ঘটনায় ওই তিন কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। তাদের ১০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তরে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক কর্মদিবস পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই তিন কর্মকর্তা। এর মধ্যে ছিল দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, তুলনামূলকভাবে কম দুর্বল এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ এর আওতায় ইতোমধ্যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সরকারি মালিকানায় একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
তারা আরও দাবি করেন, বিকাশকে দ্রুত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সসহ আটটি এজেন্ডা নিয়ে সেদিন পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছিল। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর থেকেও জানানো হয়েছিল, শুধু বিকাশকে ডিজিটাল লাইসেন্স দেওয়ার জন্য পর্ষদ সভা ডাকা হয়েছে, বিষয়টি সঠিক নয়।
এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে তোলার সুযোগ রয়েছে। এই বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগেই তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনের দিন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর কয়েকটি গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচনের পর একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। পরিচালনা পর্ষদে আলোচনার বিষয় প্রকাশ্যে আনা শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাতে ‘খেয়ালি বক্তব্য’ বন্ধ করে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করতে হবে।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, তারা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন চান, কোনো ব্যক্তির নয়। তার ভাষায়, ‘স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে কথা না বললেও এখন চুপ থাকলে ভবিষ্যতে আবার প্রশ্ন উঠবে। নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়ত আমরা এতটা খোলামেলা হতাম না।’
এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন ও কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে নীল, হলুদ ও সবুজ– এই তিন প্যানেলের সমন্বয়ে একটি ঐক্য গঠনের কথাও জানা গেছে। তবে ওই সংবাদ সম্মেলনে সেই সমন্বয়কদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত সংশোধনী দ্রুত কার্যকর করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন নিয়মতান্ত্রিক দাবি আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে একটি সর্বদলীয় ঐক্য গঠনের কথাও জানা গেছে। নীল, হলুদ ও সবুজ– এই তিন প্যানেলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এ ঐক্যের সমন্বয়ক করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরীকে। তবে ১৬ ফেব্রুয়ারির ওই সংবাদ সম্মেলনে তাকে উপস্থিত দেখা যায়নি।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.