ইসরায়েল পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করলেও আপত্তি নেই: মার্কিন রাষ্ট্রদূত

ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইসরায়েল যদি প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করে নেয়, তবে তাতে তার কোনো আপত্তি থাকবে না। এই ভূখণ্ডের ওপর ইহুদি জনগণের তথাকথিত অধিকারের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেন তিনি।

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত শুক্রবার রক্ষণশীল ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসনের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ইসরায়েলের ভৌগোলিক সীমানা নিয়ে কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, এই সীমানার ভিত্তি রয়েছে বাইবেলে।

টাকার কার্লসন বলেন, বাইবেলের একটি আয়াতে ইব্রাহিমের বংশধরদের জন্য ইউফ্রেটিস নদী থেকে নীল নদ পর্যন্ত ভূমির প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ আছে। এই বিশাল এলাকার মধ্যে বর্তমান লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান এবং সৌদি আরবের অংশবিশেষও অন্তর্ভুক্ত।

কার্লসনের কথার সূত্র ধরে গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, ‘তারা যদি এই পুরো এলাকা নিয়ে নেয় তবে তা ঠিকই হবে।’

রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্যে টাকার কার্লসন কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চান, তিনি আসলেই ইসরায়েলের পুরো অঞ্চলজুড়ে সম্প্রসারণ সমর্থন করেন কি না। জবাবে মাইক হাকাবি বলেন, ‘তারা এটি দখল করতে চায় না। তারা এমন কোনো দাবিও করছে না।’

কট্টর খ্রিস্টান জায়নবাদী এবং ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই মার্কিন দূত পরে নিজের বক্তব্য কিছুটা সংশোধন করে বলেন, তাঁর কথাটি ছিল ‘কিছুটা অতিরঞ্জিত’। তবে তিনি ধর্মীয় ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদের পথ খোলা রেখে বলেন, ‘যদি তারা এই সব জায়গা থেকে আক্রমণের শিকার হয় এবং সেই যুদ্ধে জয়ী হয়ে ভূমি দখল করে নেয়, তবে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আলোচনার বিষয়।’

হাকাবির এই বক্তব্যের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একমত কি না, তা জানতে গণমাধ্যম যোগাযোগ করলেও স্টেট ডিপার্টমেন্ট কোনো মন্তব্য করেনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং শক্তির জোরে ভূমি দখল নিষিদ্ধ করা আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম ভিত্তি। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এক ঐতিহাসিক রায়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে অবৈধ ঘোষণা করে তা অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।

তবে ইসরায়েলের আইনে তাদের সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নেই। দেশটি ১৯৮১ সালে সিরিয়ার গোলান হাইটস অবৈধভাবে দখল করে নিজেদের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা সিরিয়ার ওই ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের দাবিকে স্বীকৃতি দেয়। এছাড়া ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধের পর লেবাননের ভেতরে পাঁচটি পয়েন্টে সামরিক চৌকি স্থাপন করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির অনেক রাজনীতিবিদ প্রকাশ্যে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণা প্রচার করে আসছেন। ২০২৩ সালে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ একটি মানচিত্র প্রদর্শন করে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেন, যেখানে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ছাড়াও লেবানন, সিরিয়া ও জর্ডানের অংশবিশেষকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

সাক্ষাৎকারে মাইক হাকাবি আন্তর্জাতিক আইন তদারককারী সংস্থাগুলোর সমালোচনা করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের হাত থেকে মুক্তি পেতে যে কঠোর চাপ দিচ্ছেন, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কারণ এগুলো এখন লক্ষ্যভ্রষ্ট সংগঠনে পরিণত হয়েছে এবং আইনের সমান প্রয়োগের পথে নেই।’

ইসরায়েলের প্রতি ধর্মীয় আনুগত্য ছাড়াও হাকাবি নিজের দেশেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত বা কারারুদ্ধ মার্কিন নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কথা না বলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া গত বছর দণ্ডিত ইসরায়েলি চর জনাথন পোলার্ডের সঙ্গে বৈঠকের কারণেও তিনি নিজ দেশের রক্ষণশীলদের ক্ষোভের মুখে পড়েন। পোলার্ড মার্কিন নৌবাহিনীর বিশ্লেষক থাকাকালীন ওয়াশিংটনের অত্যন্ত গোপন গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েলের কাছে বিক্রি করেছিলেন। মাইক হাকাবি জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসে পোলার্ডের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং এ জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানান। তিনি বলেন, ‘তিনি অনুরোধ করেছিলেন বলেই দূতাবাসে আসতে পেরেছিলেন। আমি তার সঙ্গে দেখা করেছি এবং সত্যি বলতে, আমি এতে অনুতপ্ত নই।’

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.