বাংলাদেশের পর্যটন খাতে গত এক দশকে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তার পেছনে কাজ করছেন কিছু স্বপ্নদ্রষ্টা উদ্যোক্তা। সেই তালিকায় উজ্জ্বল এক নাম সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ তমাল। সম্প্রতি “The Bangladesh Monitor” আয়োজিত Travel, Tourism & Hospitality Award 2025–এ তিনি শীর্ষস্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তা বা ‘Leading Tourism Entrepreneur 2025’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
এই অর্জন কেবল একটি পুরস্কার নয়; এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের ধারাবাহিক শ্রম, দর্শন এবং দায়িত্বশীল পর্যটনের প্রতি এক অটল প্রতিশ্রুতির স্বীকৃতি।
পর্যটনকে অনেকেই কেবল ভ্রমণ ব্যবসা হিসেবে দেখেন। কিন্তু সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ তমালের কাছে এটি সবসময়ই ছিল একটি সামাজিক ও পরিবেশগত দায়িত্বের ক্ষেত্র। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান Market n-Trance Holidays শুরু থেকেই চেষ্টা করেছে ভ্রমণকে কেবল আনন্দের মাধ্যম নয়, বরং সচেতনতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন সেবা প্রদান করলেও প্রতিষ্ঠানটি সবসময় গুরুত্ব দিয়েছে টেকসই পরিকল্পনা, স্থানীয় কমিউনিটির সম্পৃক্ততা এবং পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে।
তিনি বিশ্বাস করেন, পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়—এটি সংস্কৃতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর একটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য—
“If we can inspire a child to love nature today, we build a guardian of our nation’s future tomorrow with Tourism & Hospitality as tools.”
এই দর্শনের আলোকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিশু ও তরুণদের মধ্যে পরিবেশ, প্রতিবেশ, বায়োডাইভারসিটি এবং ওয়াইল্ডলাইফ সংরক্ষণ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করে আসছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা বা পেশাজীবীরা যদি ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে, তাহলে দেশের পর্যটন শিল্পও হবে আরও টেকসই।
সম্প্রতি রাজধানীতে The Bangladesh Monitor” আয়োজিত Travel, Tourism & Hospitality Award 2025 অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্মানিত উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের হাত থেকে তিনি এ সম্মাননা গ্রহণ করেন
পুরস্কার গ্রহণের পর তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই সম্মাননা তাঁর আর্থিক লেনদেন বা বার্ষিক আয়ের পরিমাণ দেখে দেওয়া হয়নি। বরং গত ১৭ বছরে গড়ে তোলা মূল্যবোধ, উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীল কাজের ধারাবাহিকতাই ছিল এই স্বীকৃতির মূল ভিত্তি।
ভ্রমণ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব, গ্রাহক আস্থা, নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা এবং শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছেন।
রাজধানীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্মানিত উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তটি তাঁর জন্য ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক দায়িত্বে থাকা একজন নীতিনির্ধারকের হাত থেকে এমন সম্মাননা গ্রহণ তাঁর কাজের দর্শনের সঙ্গে এক গভীর সামঞ্জস্য তৈরি করেছে।
এই অর্জনকে তিনি কখনোই ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখেন না। বরং তাঁর ভাষায়, এটি তাঁর পরিবার, সহধর্মিণী, কন্যা, পিতা, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, ইন্ডাস্ট্রি কলিগ, ক্লায়েন্ট, সরবরাহকারী ও শুভানুধ্যায়ীদের সম্মিলিত ভালোবাসা ও সমর্থনের ফল।
বিশেষভাবে তিনি স্মরণ করেছেন তাঁর প্রয়াত মাকে। তাঁর কথায়, আজকের তিনি তাঁর মায়ের শিক্ষা ও মূল্যবোধের ফল। ছোটবেলা থেকেই মা তাঁকে প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার চেয়ে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেছেন; অর্ধেক কাজ না রেখে শেষ করতে শিখিয়েছেন; এবং মানুষের উপকার করতে না পারলেও যেন কখনো অপকার না করেন—এই শিক্ষা দিয়েছেন।
এই সম্মাননা তিনি তাঁর মায়ের প্রতি উৎসর্গ করেছেন।
‘Leading Tourism Entrepreneur 2025’ সম্মাননা তাঁর জন্য নতুন দায়িত্বেরও সূচনা। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন নৈতিকতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী উদ্যোগ।
ভবিষ্যতে তিনি দায়িত্বশীল পর্যটন চর্চাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যেতে চান—বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এখনও সম্ভাবনাময় এক ক্ষেত্র। এই শিল্পকে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে পারলেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ তমালের অর্জন সেই সম্ভাবনারই এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ।
একজন উদ্যোক্তার সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ‘Leading Tourism Entrepreneur 2025’ সম্মাননা সেই বার্তাকেই আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.