ডলার শক্তিশালী হওয়ায় বিশ্ববাজারে কমছে সোনার দাম

বিশ্ববাজারে দুই দিন ধরে সোনার দাম কমছে। সোনার দাম কমার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো, ডলারের মান বেড়ে যাওয়া। সোম ও মঙ্গলবার ডলারের সূচকের মান বৃদ্ধির পর আজ স্থিতিশীল আছে।

বিশ্বের ছয়টি প্রধান মুদ্রার সাপেক্ষের ডলার ইনডেক্স (ডলার ইনডেক্স) বা সূচকের মান নির্ধারণ করা হয়। গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়েছে, গত দুই দিনের উত্থানের পর আজ ডলার সূচকের মান ৯৭ দশমিক ১৬ পয়েন্টে প্রায় অপরিবর্তিত আছে। স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য প্রধান মুদ্রার দাম কমেছে। ইউরোর দাম সামান্য কমে ১ দশমিক ১৮৪৬ ডলারে নেমে এসেছে। খবর গণমাধ্যমের।

এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান ছিল স্থিতিশীল। বিশ্ববাজারে আজ প্রতি ডলারে পাওয়া যাচ্ছে ১৫৩ দশমিক ২৩ ইয়েন। আগের সেশনে অর্ধশতাংশ পতনের পর পাউন্ড স্টার্লিংয়ের মান শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩৫৫৮ ডলারে নেমে আসে।

বিনিয়োগকারীরা ফেডারেল রিজার্ভ (ফেডারেল রিজার্ভ)-এর সদ্য সমাপ্ত বৈঠকে কী হয়েছে, সেই খবর জানার জন্য মুখিয়ে আছেন। অর্থাৎ চলতি বছর নীতি সুদহার হ্রাসের সম্ভাবনা কতটা, তার হদিস পেতে চান তাঁরা।

ভূরাজনীতির দিকে বাজারের নজর আছে। জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছে ইরান; একই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়ার শান্তি আলোচনা চলছে।

অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ব্যাংকের মুদ্রা কৌশলবিদ সামারা হাম্মুদ এক নোটে লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে অস্থিরতার কারণে ডলারের পালে হাওয়া লেগেছে, যদিও বিষয়টি হয়তো সাময়িক। তবে সুইজারল্যান্ডে পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘সাধারণ সমঝোতা’ হওয়ার খবরে বাজারের উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।

ডলার ও স্বর্ণের সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের অলিখিত নিয়ম হলো, এক প্রান্তে ডলার, অন্য প্রান্তে স্বর্ণ। অর্থাৎ একটির শক্তি বাড়লে অন্যটির শক্তি কিছুটা হলেও কমে যায়। আবার কোনো কোনো সময় দুটি পাশাপাশি এগোয়। এই সম্পর্ক পুরোপুরি সরলরৈখিক নয়, অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে তা গভীরভাবে জড়িত।

স্বর্ণের আন্তর্জাতিক দাম ডলারে নির্ধারিত হয়। ফলে ডলার শক্তিশালী হলে একই পরিমাণ স্বর্ণ কিনতে অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের বেশি খরচ করতে হয়। এতে চাহিদা কমে যায়। স্বাভাবিকভাবেই তখন সোনার বেচাকেনা কমে যায়। এর বিপরীতে ডলার দুর্বল হলে বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে—চাহিদা বাড়ে, দামও চাঙা হয়।

কিন্তু বিষয়টি শুধু বিনিময় হারের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুদের হার ও আরও নানা প্রসঙ্গ। স্বর্ণে বিনিয়োগ করে সুদ পাওয়া যায় না। তাই যখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেডারেল রিজার্ভ) যখন সুদের হার বাড়ায়, তখন ডলারে বিনিয়োগের মুনাফা বাড়ে। বিনিয়োগকারীরা সুদভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন, অর্থাৎ বন্ডের প্রতি, স্বর্ণের আকর্ষণ তখন কমে যায়। এতে ডলার শক্তিশালী হয়। আবার সুদ কমলে বা ভবিষ্যতে সুদ কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে স্বর্ণের প্রতি আকর্ষণ ফিরে আসে।

এর সঙ্গে আছে মূল্যস্ফীতির মনস্তত্ত্ব। মূল্যস্ফীতি বাড়বে—এমন আশঙ্কা তৈরি হলে অনেকে স্বর্ণকে ‘মূল্য সংরক্ষণকারী’ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। তখন ডলার দুর্বল হোক বা না হোক, স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যদি বাস্তব সুদহার (সুদের হার থেকে মূল্যস্ফীতি বাদ দিলে যা থাকে) কমে যায়, স্বর্ণ তখন আরও শক্ত ভিত পায়।

তবে এই সম্পর্ক সব সময় একমুখী নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক সংকট—এসবের সময় কখনো কখনো ডলার ও স্বর্ণের দাম একসঙ্গে বাড়ে। কেননা উভয়ই তখন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বিনিয়োগকারীরা তখন ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ছেড়ে নিরাপদ সম্পদের দিকে ছোটেন।

সব মিলিয়ে ডলার ও স্বর্ণের সম্পর্ক একধরনের গতিশীল ভারসাম্য। কখনো সুদের হার সেটি নির্ধারণ করে, কখনো মূল্যস্ফীতি, কখনো বা ভূরাজনীতি। তাই বাজার বিশ্লেষণে শুধু বিনিময় হার নয়, বরং নীতিনির্ধারকদের সংকেত, বৈশ্বিক ঝুঁকি আর বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব—সবই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.