ভারতের সুপরিচিত লেখক অরুন্ধতী রায় ফিলিস্তিনের গাজা ঘিরে আয়োজকদের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। গত শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি জানান, উৎসবের জুরি প্রেসিডেন্ট ও জার্মানির বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ভিম ভেন্ডার্স-এর মন্তব্যের প্রতিবাদে তিনি উৎসবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে গাজা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ভেন্ডার্স বলেছিলেন, চলচ্চিত্র ‘রাজনীতির বাইরে থাকা’ উচিত।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিবৃতিতে অরুন্ধতী বলেন, বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে ভেন্ডার্স ও জুরির অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া আমাকে ‘স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ’ করেছে।
অরুন্ধতীর উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার জিতে। এবারের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে ১৯৮৯ সালের চলচ্চিত্র ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভজ ইট দোজ ওয়ানজ’-এর পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ দেখানোর কথা ছিল। অরুন্ধতী চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন।
অরুন্ধতী বলেন, ভেন্ডার্স ও জুরির অন্য সদস্যদের ‘বিবেকবর্জিত’ মন্তব্য তাঁকে ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে’ নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির ইসরায়েলের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভেন্ডার্স বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে আমরা আসলেই ঢুকতে পারি না।’ তিনি নির্মাতাদের ‘রাজনীতির পাল্টা ভারসাম্য’ রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন।
জুরির আরেক সদস্য ইভা পুশ্চিন্সকা বলেন, এ বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নিতে জুরির কাছে প্রত্যাশা করা ‘কিছুটা অন্যায্য’।
বিবৃতিতে অরুন্ধতী বলেন, ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়, তাঁদের এ মন্তব্য সত্যিই হতবাক করে দেওয়ার মতো ব্যাপার।’
গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরায়েল রাষ্ট্রের গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেন অরুন্ধতী রায়।
অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নির্মাতা ও শিল্পীরা যদি দাঁড়িয়ে এটা বলতে না পারেন, তাহলে তাঁদের জেনে রাখা উচিত, ইতিহাস তাঁদের বিচার করবে।’
অরুন্ধতী ভারতের বিখ্যাত জীবিত লেখকদের একজন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের তীব্র সমালোচক এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থক।
গাজা ইস্যুতে এবারের উৎসব কর্তৃপক্ষের অবস্থানের প্রতিবাদে মিসরের দুই প্রয়াত নির্মাতার দুটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র দুটি হলো আতিয়াত আল আবনুদির ‘স্যাড সং অব তোহা’ ও হুসেন শরিফের ‘দ্য ডিজলোকেশন অব আম্বার’।
এক বিবৃতিতে উৎসবের এক নারী মুখপাত্র গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বার্লিনালে এসব সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়।’
এ মুখপাত্র আরও বলেন, উৎসবে ‘আমরা তাঁদের স্বাগত জানাতে পারছি না বলে দুঃখিত। তাঁদের উপস্থিতি উৎসবের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করত।’
রাজনীতি থেকে দূরে থাকা
বার্লিনালের ঐতিহ্যগতভাবে সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল আয়োজনের খ্যাতি আছে, কিন্তু এবারের আসরে এখন পর্যন্ত অনেক তারকাকে সমসাময়িক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে অবস্থান গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
‘সানি ড্যান্সার’ ছবির মার্কিন অভিনেতা নিল প্যাট্রিক হ্যারিসকে শুক্রবার প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি আপনার শিল্পকে রাজনৈতিক বলে মনে করেন? এটি কি ‘ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’ সাহায্য করতে পারে?
উত্তরে হ্যারিস বলেন, আমি ‘অরাজনৈতিক কাজ করতে আগ্রহী।’ আমি এমন কাজ করতে চাই, যা আমাদের ‘বিকটভাবে অ্যালগরিদমভিত্তিক ও বিভক্ত পৃথিবীতে’ মানুষের মধ্যে সংযোগ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
এবারের আসরে সম্মানসূচক ‘গোল্ডেন বিয়ার’ বিজয়ী মালয়েশীয় অভিনেত্রী মিশেল ইয়োকে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, সেখানকার পরিস্থিতির ‘সবকিছু বুঝি, আমি এমনটি দাবি করতে পারি না।’
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব এর আগেও গাজা প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্কিত হয়েছে।
২০২৪ সালে এই উৎসবের সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতেছিল ‘নো আদার ল্যান্ড’। প্রামাণ্যচিত্রটি ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনপদ বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নিয়ে নির্মিত।
জার্মানির সরকারি কর্মকর্তারা সে বছরের পুরস্কার অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ছবির পরিচালক এবং অন্যদের গাজা–বিষয়ক বক্তব্যকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।
হামাসের যোদ্ধারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায়। এতে ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন। জবাবে গাজায় সর্বাত্মক হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.