গতকাল শুক্রবার বার্ষিক মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে মের্ৎস বলেন, বড় শক্তিগুলোর প্রাধান্য বিস্তারের এই সময়ে ‘আমাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত নয়’। তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয়দের ‘ত্যাগ স্বীকারে’ প্রস্তুত থাকতে হবে।
ফ্রিডরিখ মের্ৎস এ-ও স্বীকার করেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘গভীর বিভাজন’ সৃষ্টি হয়েছে।
সম্মেলনটি এমন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছেন। এ ছাড়া তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্মেলনে মের্ৎসের ভাষণ শুনছিলেন। আজ তিনি নিজেও ভাষণ দেবেন। এর আগে রুবিও ‘ভূরাজনীতিতে এক নতুন যুগ’-এর কথা বলেছেন।
চলতি বছরের সম্মেলনে প্রায় ৫০ জন বিশ্বনেতার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ইউরোপের প্রতিরক্ষা এবং ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে।
এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ন্যাটো সামরিক জোটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের আগ্রহ এবং সে-সংক্রান্ত হুমকির কারণে অনেক ইউরোপীয় নেতা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন, যা তাঁদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের প্রতি বিশ্বাস ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে।
গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয় গ্রিনল্যান্ড আমাদের চাইবে…আমরা ইউরোপের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক রাখি। দেখব সব কীভাবে ঠিক হয়। আমরা বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনাই করছি।’
এবারের বার্ষিক সম্মেলনের এজেন্ডাতে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা দেশগুলো ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি—এসব বিষয়ও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন একাধিক সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মের্ৎস সম্মেলনে বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের আরও স্পষ্টভাবে বলতে হবে—এই ব্যবস্থা, যতটা অসম্পূর্ণই হোক না কেন, সর্বোত্তম অবস্থাতেও, সেই রূপে আর বিদ্যমান নেই।’
মের্ৎস আরও বলেন, ‘ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিভাজন, একটি গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক বছর আগে মিউনিখে এটি খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন।’
মের্ৎস আরও বলেন, ‘তিনি ঠিক ছিলেন। মাগা (আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলুন) আন্দোলনের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ আমাদের নয়।’
মের্ৎস বলেন, ‘যখন কোনো বক্তব্য মানবমর্যাদা ও সংবিধানের বিরুদ্ধে যায়, তখন আমাদের কাছে বাক্স্বাধীনতার সীমা এখানেই শেষ। আমরা শুল্ক আর সংরক্ষণবাদের প্রতি বিশ্বাস করি না, বরং মুক্ত বাণিজ্যের প্রতি বিশ্বাসী।’
গত বছর জেডি ভ্যান্স ইউরোপের বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের বাক্স্বাধীনতা ও অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর সেই বক্তৃতা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের মধ্যে অভূতপূর্ব উত্তেজনার একটি বছর শুরু করেছিল।
তবে মের্ৎস দশকব্যাপী অংশীদারত্বকে উপেক্ষা করেননি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘চলুন ট্রান্সআটলান্টিক বিশ্বাস মেরামত ও পুনর্জীবিত করি।’
জার্মানির এই নেতা আরও বলেছেন, তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে যৌথ ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে ‘গোপন আলোচনা’ চালাচ্ছেন। তিনি এ নিয়ে আর কোনো বিশদ তথ্য দেননি।
ইউরোপে শুধু ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তবে জার্মানি এবং অন্যান্য অনেক ইউরোপীয় দেশ ঐতিহ্যগতভাবে ন্যাটো জোটের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সুরক্ষা বলয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
শুক্রবার পরে সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় এমানুয়েল মাখোঁ আবারও জোর দিয়ে বলেন, নতুন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপকে ‘ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তৈরি হতে শিখতে হবে’।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.