বিদ্যমান ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ একটি মৌলিক আইন হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এ আইনে ব্যাপক সংশোধনী আনা বাস্তবসম্মত হবে না। পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ আদেশ পর্যালোচনা ও সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করাই অধিকতর যৌক্তিক হবে।
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) এ কথা জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এক পৃষ্ঠার একটি আধা সরকারি চিঠি (ডিও) দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে।
চিঠির বিষয়ে জানতে সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, ‘গভর্নরকে পাঠানো চিঠিতেই সব বলা আছে, কেন এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় করতে চাইনি। আমি মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাংকের যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশে কোনো সংশোধনী আনতে গেলে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর রাজনৈতিক সরকারের সময় তা হওয়ায় ভালো।’
সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজেও একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাবিত বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশের সংশোধনীর বিভিন্ন দিক তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ ও অপসারণ, গভর্নরের পদমর্যাদা মন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ কাঠামোর পরিবর্তন এবং প্রজাতন্ত্রের আর্থিক দায় সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয় নজরে এসেছে।
অর্থ উপদেষ্টা চিঠিতে বলেন, বিদ্যমান আদেশ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপারেশনাল ও ফাংশনাল কার্যক্রম পালনে স্বাধীনতা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিনির্ধারণ বা কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয় না। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিদ্যমান কো–অর্ডিনেশন কাউন্সিলের কার্যপরিধি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি, ব্যাংক ও অ–ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি কাঠামো আরও শক্তিশালী করাসহ আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশে কোনো সংশোধন ও সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত সংশোধনগুলোর যৌক্তিকতা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থ উপদেষ্টা। এ জন্য চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ ও আলোচনা করা সমীচীন।
গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশের একটি খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। তার আগে গভর্নরের মর্যাদা বাড়িয়ে ও নিয়োগপ্রক্রিয়া বদলানোর প্রস্তাব করা হয়। খসড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদে উপস্থাপনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
খসড়ার সঙ্গে পাঠানো চিঠিতে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকে এটি তৈরি করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, এ ধরনের সংশোধন আনতে অতীতে একাধিকবার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণ ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। সংশোধন করা গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে।
গভর্নরের পদমর্যাদা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমমর্যাদায় উন্নীত হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বাড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি একটি মৌলিক কাঠামোগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আইএমএফ ২০২১ সালে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনতা কাঠামো’ নামে যে কাঠামো করেছে, তার সুপারিশের সঙ্গেও গভর্নরের মন্ত্রী মর্যাদা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ৯ জন সদস্য রয়েছেন, যার চেয়ারম্যান গভর্নর। আরও থাকেন অর্থ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, একজন ডেপুটি গভর্নর ও বেসরকারি খাত থেকে চারজন।
পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি তিনজন থেকে কমিয়ে একজন করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সদস্য চারজন থেকে ছয়জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার করার প্রস্তাব ছিল। শূন্য হলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের মাধ্যমে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে তিন সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন হবে। কমিটির নেতৃত্ব দেবেন সাবেক অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা, পরিকল্পনামন্ত্রী বা পরিকল্পনা উপদেষ্টা অথবা একজন বিদায়ী বা সাবেক গভর্নর।
গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করার কথা বলা হয়েছিল। এছাড়া নিজস্ব জনবলের বেতন কাঠামো, পদ সৃষ্টিসহ শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই দেবে।
নীতি বাস্তবায়নে নির্বাহী–নির্ভরতা কমানোর জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বিধি প্রণয়নের ক্ষমতাও সংযোজনের প্রস্তাব ছিল খসড়া অধ্যাদেশে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.