যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব হারাচ্ছে ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব হারাচ্ছে ইসরায়েল। এ নিয়ে বিরোধীদের চাপের মুখে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে আদৌ কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে তেল আবিব, তা নিয়ে সন্দিহান ইসরায়েলিরা। অথচ কয়েক মাস আগেও অঞ্চলটিতে নিজেদের আধিপত্যের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে মনে করছিল ইসরায়েল।

ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, ‘ইসরায়েলের বিরোধীরা অভিযোগ করছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকার করে গাজায় যুদ্ধ খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে দিয়েছেন। ইসরায়েলকে লেবানন থেকে কার্যত তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সিরিয়ায় কাজ করার স্বাধীনতাও বন্ধ হয়ে গেছে। ইসরায়েলের হাতে এখন যা আছে, তা হলো ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার স্বাধীনতা। আর কাতার, তুরস্ক ও মিশর এখন ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও গাজার বিষয়ে যুক্ত হওয়ায়, সেটুকুও বেশিদিন আর থাকবে না।’

ইরানে সম্ভাব্য হামলা নিয়ে নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের শীর্ষ ব্যক্তিরা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলের আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের মতো করে গড়ে নেওয়ার ক্ষমতা যে কমে গেছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

গাজায় দুই বছর ধরে চলা গণহত্যায় ইসরায়েলের হাতে ৭১ হাজার ৮০০–এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন নেতৃত্বে চলে এসেছে বলেই মনে হচ্ছে। গাজার প্রশাসন তদারকির বোর্ডে তুরস্ক ও কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইসরায়েলের আপত্তিও অগ্রাহ্য করেছে ওয়াশিংটন।

সিরিয়ায় নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা সরকারের ক্ষমতা দুর্বল করার ইসরায়েলি আকাঙ্ক্ষাও ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজের কারণে বাধার মুখে পড়েছে। বরং যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে নেতানিয়াহু সরকারকে দামেস্কের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাপ দিচ্ছে। লেবাননেও ইসরায়েলের পদক্ষেপ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নির্ণায়ক—হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতের ওপর নির্ভরশীল বলেই জানা যাচ্ছে।

ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে ইসরায়েল কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে—তা অনেকের কাছেই অনিশ্চিত। এমনকি এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না যে, ইসরায়েলের উদ্বেগ উপেক্ষা করেই ওয়াশিংটন আলোচনায় বসতে পারে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নেতানিয়াহুর সাবেক সহকারী ও রাজনৈতিক জরিপ বিশ্লেষক মিচেল বারাক বলেন, ‘একটি আশঙ্কা রয়েছে—ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলা না চালিয়ে আলোচনার পথে যাবেন। এতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকবে, কিন্তু তিনি নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরে এমন এক সমঝোতা করবেন, যাতে শাসকগোষ্ঠী থেকেই যাবে। তিনি লেনদেনভিত্তিক রাজনীতিবিদ—এটাই তার ধরন। গাজার মতোই হবে—ইসরায়েল চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করবে, তারপর নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, যার স্বার্থ ট্রাম্পের অধীনে সব সময় আমাদের সঙ্গে মেলে না।’

‘বিগ ব্যাড উলফ’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সক্ষমতা সীমিত হলেও, নতুন একটি যুদ্ধ শুরু হলে তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জন্য বর্তমান সংকট থেকে স্বস্তি দেবে—এই ধারণা প্রায় সবার মধ্যেই রয়েছে।

চ্যাথাম হাউজের গবেষক যোসি মেকেলবার্গ বলেন, ইরান হলো ইসরায়েলের ‘বিগ ব্যাড উলফ’—এমন এক ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, যাকে অনেক ইসরায়েলি কেবল ইসরায়েল ধ্বংসের জন্যই বিদ্যমান বলে মনে করেন।

তার মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নেতানিয়াহুর ঘরোয়া সংকট থেকে দৃষ্টি সরানোর কার্যকর উপায় হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঘিরে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত, বিচার বিভাগের নজরদারি ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা এবং তার চলমান দুর্নীতির মামলাগুলো।

মেকেলবার্গ বলেন, হিব্রুতে একটা প্রবাদ আছে—‘সৎ মানুষের কাজ অন্যরা করে দেয়।’ আমি এক মুহূর্তের জন্যও বলছি না যে নেতানিয়াহু সৎ, তবে তিনি নিশ্চয়ই চান তার কাজটা অন্যরা করে দিক।

যুদ্ধ চান নেতানিয়াহু?

ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে জনমনে আসলে কতটা আগ্রহ রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

গত বছরের জুনে শুরু হওয়া সংঘাতে ইসরায়েল ইরানের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পেরেছিল। তবে ইরানও বারবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়। এটি দেখিয়ে দেয়—ইসরায়েল এ অঞ্চলে যে যুদ্ধগুলো চালাচ্ছে, সেগুলো থেকে সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়।

গোল্ডবার্গের মতে, নেতানিয়াহুর জন্য ইরানের সঙ্গে সংঘাতের হুমকি বাস্তব যুদ্ধের চেয়েও বেশি উপকারী। তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহুর যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। তার আসলে কিছুই করার দরকার নেই, শুধু টিকে থাকতে পারলেই হলো—আর সেটা তিনি দারুণভাবে পারেন।’

তার মতে, বিশ্বাসযোগ্য কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাব এবং বাস্তব যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

গোল্ডবার্গ বলেন, নেতানিয়াহুর বিচার বিভাগ সংস্কারের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে একটা ঠাট্টার কথা চালু আছে—‘এইবার সে শেষ।’ কিন্তু নেতানিয়াহু কখনোই শেষ হন না। তিনি একটি গণহত্যা চালিয়েছেন, আর ইসরায়েলের মানুষ আপত্তি তুলছে কেবল তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তিনি অঞ্চলজুড়ে সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব হারাচ্ছেন, অথচ খুব কম মানুষই সেটা লক্ষ্য করছে। আমার মনে হয় না, এবারই ‘শেষ’ হবে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.