গুম বন্ধ হলেও চলছে গণগ্রেপ্তার ও জামিন না দেওয়ার চর্চা: এইচআরডব্লিউ

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বিচারে আটক করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে ফৌজদারি অভিযোগে শত শত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চর্চাও ছিল। আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, সদস্য এবং সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে হেফাজতে রয়েছেন, যাদের বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত জামিন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এদের মধ্যে অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক এবং রাজনৈতিক কর্মী রয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সংস্থাটির ভাষ্য, ২০২৪ সালে ক্ষমতা নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যাপক হিমশিম খাচ্ছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজারো মানুষকে নির্বিচার আটকের অভিযোগও তুলেছে সংস্থাটি।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৬–এ এমন তথ্য তুলে ধরে এইচআরডব্লিউ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত ব্যাপক গুমসহ ভয় ও দমনের যে পরিবেশ ছিল, তার কিছু অংশ শেষ হয়েছে বলে মনে হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটক করেছে এবং মে মাসে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। ১৭ নভেম্বর, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ২০২৪ সালের বিক্ষোভ দমনের চেষ্টার সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড শাস্তি প্রদান করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ভয়াবহ গণপিটুনি’ বা ‘মব ভায়োলেন্স’। এর মধ্যে ছিল উগ্রপন্থি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো, যারা নারী অধিকার এবং লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন। বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে গণপিটুনিতে বা মব সহিংসুতায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছে।

অতীত লঙ্ঘনের দায়বদ্ধতা

 

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলনের সময় পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত ছিল, যার ফলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। তবে অভিযুক্ত অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকার সীমিত অগ্রগতি দেখিয়েছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশ পুলিশের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন যে, ২০২৪ সালের বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার জন্য মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার আইসিটিতে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি একটি অভ্যন্তরীণ আদালত; যা এর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। নভেম্বরে অনুপস্থিতি থাকা অবস্থায় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে আইসিটি বিচারের পর মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। হেফাজতে থাকা একজন সাবেক পুলিশ প্রধান প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেন এবং তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালটি সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড লঙ্ঘনের অভিযোগে জর্জরিত ছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার আদালত গঠনকারী আইন সংশোধন করে কিছু উন্নতি করেছে, তবুও এতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা বা ‘ডিউ প্রসেস প্রোটেকশন’-এর অভাব রয়েছে এবং এতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান অন্তর্ভুক্ত আছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থি। অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিচার ও ভেঙে দেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতাও দিয়েছে।

 

অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের আমলে সংঘটিত গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করে, যা ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫০টিরও বেশি অভিযোগ পেয়েছে। কমিশনাররা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন যে, তারা উল্লেখযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা প্রমাণ ধ্বংস করেছেন, সহযোগিতা সীমিত করেছেন এবং অভিযুক্তদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছেন। অক্টোবরে কর্তৃপক্ষ গুমের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

 

স্থবির সংস্কার

 

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনামলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাচনী ব্যবস্থা, পুলিশ, নারী অধিকার, শ্রম অধিকার এবং সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করে। এরপর সুপারিশকৃত সংস্কারের একটি প্যাকেজ চূড়ান্ত করার জন্য ইউনূসের সভাপতিত্বে একটি কনসেনসাস বা ঐক্যমত কমিশন গঠন করা হয়।

 

তবে রাজনৈতিক অংশীজনদের মধ্যে ঐক্যমত্যের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে খুব কম সংস্কারই গৃহীত বা বাস্তবায়িত হয়েছে। ৫ আগস্ট ইউনূস ‘জুলাই ঘোষণা’, যে মাসে হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল তার নামে, ঘোষণা করেন এবং অক্টোবরে আরও বিস্তারিত ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা করেন। নভেম্বরে ইউনূস নির্বাচনের সময় সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর একটি গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন, যা পরবর্তী সরকারকে জুলাই সনদের অংশবিশেষ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করবে।

 

নির্বিচারে আটক, গণগ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যু

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বিচারে আটক করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে ফৌজদারি অভিযোগে শত শত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চর্চাও ছিল। আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, সদস্য এবং সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে হেফাজতে রয়েছেন, যাদের বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত জামিন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এদের মধ্যে অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক এবং রাজনৈতিক কর্মী রয়েছেন।

 

৮ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সদস্য ও ছাত্র বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামক একটি অভিযানের মাধ্যমে আরও কিছু মামলা দায়ের করা হয়, যার ফলে অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কঠোর বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আরও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকতে পারে, যা আগে ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হতো।

 

১৬ জুলাই, গোপালগঞ্জ শহরে নিরাপত্তা বাহিনী ও বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হয়। এটি ২০২৪ সালের আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির একটি সমাবেশের পর ঘটে। পুলিশ পরে শত শত কথিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে নির্বিচারে আটক করে এবং ৮ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি (যাদের বেশিরভাগই অজ্ঞাতনামা) মানুষের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করে। সরকার “গণগ্রেপ্তার” চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

 

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর অক্টোবরের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনের কারণে মারা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৮,০০০ মানুষ আহত এবং ৮১ জন নিহত হয়েছে।

 

নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার

 

যৌনও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ব্যাপক আকারে রয়ে গিয়ে ছিল এবং নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষাবা ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ খুব কম ছিল। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নারীরা অগ্রণীভূমিকা পালন করলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তাদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব ছিল না।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়. এপ্রিলে নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় ব্যবস্থাসহ প্রস্তাবের জন্য গঠিত কমিশন বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, নারীদের সমানভাবে অভিভাবকত্ব প্রদান, উত্তরাধিকার আইন সংস্কার এবং সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির সুপারিশ করে। এর কিছু দিন পরেই ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রায় ২০ হাজার সমর্থক রাজধানী ঢাকায় অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর প্রতিবাদে সমাবেশ করে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী

২০২৪ সালের শুরু থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং জাতিগত সশস্ত্রগোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াইও নির্যাতন থেকে বাঁচতে ১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের পক্ষে প্রচারনা চালিয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের আগে বাংলাদেশ আগস্টে কক্সবাজারে অংশীজনদের মধ্যে একটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্যাম্পগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অপরাধী চক্রের চাপে রোহিঙ্গারা যৌন সহিংসতা, অপহরণ, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং চাঁদাবাজিসহ নানারকমের চাপ এবং সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং চিকিৎসা সেবার প্রায় সম্পূর্ণ অভাবের কথা জানিয়েছেন।

বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস এবং নতুন আগমনের ফলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও প্রাক-শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এবং খাদ্য ও রান্নার গ্যাসের বরাদ্দ কমে গেছে। মানবিক কর্মীরা রোগের প্রাদুর্ভাব, শিশুদের অপুষ্টির পাশাপাশি মানব পাচার, অনিয়মিত অভিবাসন এবং গ্যাং সহিংসতার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

 

জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা

২৬ ও ২৭ জুলাই, রংপুর জেলায় একদল জনতা হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের অন্তত ১৪টি বাড়ি ভাঙচুর করে। বছরের বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অব্যাহত লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করার সময় সংঘটিত অপরাধের মধ্যে ধর্ষণও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 

অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার

শেখ হাসিনার পতনের কারণ হওয়া ২০২৪ সালের বিক্ষোভ ছিল সম্পদের অসম বন্টনের বিরুদ্ধে একটি ক্ষোভের প্রতিফলন। ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার (শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে নিয়োজিত আছে তারা বাদে) ২০২৪ সালে ৩০ শতাংশের বেশি ছিল, যা আঞ্চলিক মানদণ্ডে অনেক বেশি এবং লিঙ্গ বৈষম্যও ছিল প্রকট। মুদ্রাস্ফীতি কমলেও তা উচ্চস্তরেই ছিল, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৫ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে ‘চরমদারিদ্র্য ৯.৩ শতাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং অতিরিক্ত ৩ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়বে।’

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস ছিল পোশাকখাত, যেখানে অধিকাংশ কর্মী নারী। সেপ্টেম্বরে মালিক ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে একটি চুক্তিস্বাক্ষরিত হয় যা কিছু শ্রমিকের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারে, যদিও নতুন আইনগৃহীত হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের আনুমানিক ৯০ শতাংশ শ্রমিক সুরক্ষাহীন থেকে যাবে। জানুয়ারিতে চুরির অভিযোগে পোশাক কারখানার এক শ্রমিককে ঊর্ধ্বতন কর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা

মে মাসে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি সংশোধনী ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের ওপর ‘সাময়িক’ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞায় অনেক কিছুর সঙ্গে সঙ্গে দলটির সমর্থনে সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা এবং অনলাইন বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত।

২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা প্রায়শই রাজনৈতিকদলের সদস্য এবং সহিংস জনতারমতো অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলো ঘটিয়েছে। পুলিশ ও আদালত জনসাধারণেরপক্ষ থেকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার অভিযোগে লেখকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে মামলা পরিচালনা করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় অননুমোদিত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ দেয়, যার মধ্যে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ অন্যতম। এটি রাজনৈতিক সমালোচকদের অপরাধী হিসেবে গণ্য ও জেল দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়। মার্চ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপব্যবহৃত নয়টি ধারা বাতিলের জন্য সিএসএ সংশোধন করে। তবে সংশোধনীতে এমনকিছু বিধান রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পুরোপুরি মেনে চলে না।

 

যৌন অভিমুখিতা ও লিঙ্গীয় পরিচয়

বাংলাদেশে সমলিঙ্গের আচরণ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার শাস্তি ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল এবংট্রান্সজেন্ডার (এলজিবিটি) ব্যক্তি এবং তাদের সমর্থকরা রাজনীতিবিদদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসহ সহিংসতার হুমকি বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.