ফ্যাসিবাদের করুণ পরিণতির কথা মাথায় রেখে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ

ফ্যাসিবাদের করুণ পরিণতির কথা মাথায় রেখে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

বুধবার খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬’ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে খুলনা বিভাগীয় প্রশাসন আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশ দেন।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিবাদের বীজ বপন হয়েছিল অস্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের পুরো যন্ত্র পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিটি কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছিল। স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এর ফলস্বরূপ একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদী কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

উপদেষ্টা বলেন, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য ছাত্রজনতা ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার মদদদাতা, ইন্ধনদাতা, পক্ষপাতিত্বকারী, সহায়তাকারী, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীরা কেউ কেউ অনেকেরই পূর্ব পরিচিত। তারা সরকার যন্ত্রেরই অংশ ছিলো। আজকে তাদের অনেকের করুণ পরিণতি সম্পর্কে সবাই অবহিত আছেন। অনেকে চাকরিচ্যুত, অনেকে পলাতক, দেশান্তরিত, জেলে আছেন, আইন-আদালত ফেস করছেন। এমনকি তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরাও আজ কঠিন পরীক্ষার ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট সবাই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এদেশের আপামর জনগণ, রাজনৈতিকদলসহ সর্বমহলের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আপনাদের কাঁধে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এমন এক মানদণ্ড স্থাপিত হবে, যা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হবে। উপদেষ্টা এসময় সামান্যতম ভুল বা বিচ্যুতি যাতে নির্বাচন তথা দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে না পারে এবং জনগণের আস্থা হারাতে না পারে সেদিকে সজাগ ও সতর্ক থাকার জন্য কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

তাছাড়া কোন ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম বা ব্যালট বাক্স ছিনতাই হলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ‘কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল’ গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট যে কোন অভিযোগ এ সেলে করা যাবে। তিনি বলেন, এই সমন্বয় সেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি থাকবেন। এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য তাৎক্ষণিক আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’-এর ব্যবহার যেটি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) কর্তৃক প্রস্তুত করা হয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসারসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম যুক্ত থাকবে। উপদেষ্টা বলেন, অ্যাপটি তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও এর দ্রুত প্রতিকার ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরো বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দ্রুত প্রবেশপত্র প্রদান সম্পন্ন করতে হবে এবং ভোটকেন্দ্রে তাদের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের দ্রুত পরিচয়পত্র প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। তারা নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য চাইতে পারে। এ বিষয়ে তাদেরকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পরিবেশ এমন উন্নত করতে হবে যাতে সবাই আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারে।

পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা বলেন, খুলনা বিভাগের নির্বাচনী প্রস্তুতি ভালো। সাংবাদিকদের সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপতথ্য বা মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করলে ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে। তিনি আরো বলেন, এবাবের তিনটি বিষয় নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে যা পূর্ববর্তী নির্বাচনসমূহে সম্ভব হয়নি। সেগুলো হলো নির্বাচন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার (বডি ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি, ড্রোন ইত্যাদি), আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও এনটিএমসি প্রণীত ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’ এর ব্যবহার। উপদেষ্টা এগুলোর সফল প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব হবে মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.