বীমা খাতে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতে ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান

বাংলাদেশের বীমা খাতে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন স্বীকৃতি প্রদান এবং গ্রাহকের আস্থা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) আয়োজিত “IDRA Insurance Excellence Award 2025” প্রদান অনুষ্ঠান গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আদিবা আহমেদ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বি. এম. ইউসুফ আলী।

উক্ত অনুষ্ঠানে আইডিআরএ’র সদস্য (প্রশাসন) মো. ফজলুল হক স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। এ সময় “আইডিআরএ: ইতিবাচক পরিবর্তনের এক যাত্রা” শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে বীমা খাতে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন বিশেষ অবদান রাখায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানদের “IDRA Insurance Excellence Award 2025” প্রদান করা হয়। অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলোর মাঝে প্রথম স্থান অর্জন করেছে প্রগতি ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন, তৃতীয় স্থানে রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, চতুর্থ স্থানে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি এবং যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। অন্যদিকে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলোর মাঝে প্রথম স্থান অর্জন করেছে আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (মেটলাইফ)। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, তৃতীয় স্থানে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, চতুর্থ স্থানে জীবন বীমা কর্পোরেশন এবং যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।

অ্যাওয়ার্ড প্রদান পর্বে বক্তব্য রাখেন প্রগতি ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সৈয়দ সেহাব উল্লাহ আল মনজুর। তিনি জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত বিমান দুর্ঘটনায় মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা। এ ঘটনায় প্রগতি ইন্স্যুরেন্স পিএলসি প্রায় ৩০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করেছে, যেখানে প্রাপ্ত প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ টাকা। এই পরিশোধের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে প্রগতি ইন্স্যুরেন্স সবসময় ব্যবসায়ীদের পাশে থেকে সংকটময় সময়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে গণমাধ্যমকে জানান। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন মেটলাইফ বাংলাদেশ-এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলা উদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, এই স্বীকৃতি তাদের সামনে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে। সলভেন্সি মার্জিনসহ সব আইন মেনে চলার মাধ্যমে তারা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও ইতিবাচক ও টেকসই অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বি. এম. ইউসুফ আলী, বিমা রেজুলেশন আইন ২০২৫ খসরা পাস করার অনুরোধ জানান। এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আদিবা আহমেদ বলেন, এমন স্বীকৃতি অনুষ্ঠান বীমা খাতে উৎকর্ষতা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বকে উৎসাহিত করে এবং শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ—আইডিআরএ—বিগত বছরগুলোতে নীতিমালা প্রণয়ন, তদারকি শক্তিশালীকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। এই ধরনের সম্মাননা উদ্যোগ আইডিআরএ’র সেই প্রচেষ্টারই একটি বাস্তব প্রতিফলন। সরকার চায়, বীমা খাত আরও জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠুক। সেই লক্ষ্যে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন, দাবি নিষ্পত্তির সময় কমানো এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। সামনে বীমা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য আরও একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে তিনি সকল বীমা কোম্পানিকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান, যাতে ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম জোরদার করে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান ড. এম. আসলাম আলম বলেন, বীমা খাতকে সংকট থেকে উত্তরণ এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে প্রণীত আইনগুলো দ্রুত কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, ডিজিটাইজেশন এখন সময়ের দাবি—এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। তিনি আরও বলেন, বীমা খাতে প্রশিক্ষিত ও পেশাদার জনবলের ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কখনও কখনও শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ঘটনাও তাদের উদ্বিগ্ন করে। এই খাতে আরও বেশি দক্ষ ও পেশাদার মানবসম্পদ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বীমা খাতের সব প্রতিষ্ঠানকে একভাবে দেখা উচিত নয়—এখানে অনেক ভালো কোম্পানিও রয়েছে। চেয়ারম্যান আরও উল্লেখ করেন, এই মূল্যায়ন ও পুরস্কার প্রদান ২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করা হয়েছে, যেখানে প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি, ক্লেইম সেটেলমেন্ট, ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং টপ ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতেও একই ধরনের মূল্যায়ন করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতিবছর শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল—বরং এটি সকলকে আরও ভালো করার জন্য উৎসাহিত করার একটি স্বীকৃতি মাত্র।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বীমা খাত দ্রুত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। ডিজিটালাইজেশন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, অনলাইন পলিসি ইস্যু এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি—এসব উদ্যোগ আমাদের ধীরে ধীরে বৈশ্বিক মানের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। আজ গ্রাহকরা মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সহজেই বীমা সেবা গ্রহণ করতে পারছে, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় করছে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কমাতে হলে আমাদের গ্রাহককেন্দ্রিকতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে বীমা পণ্যে উদ্ভাবন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আইডিআরএ এই ক্ষেত্রে যে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সুশাসিত বীমা খাত গড়ে তুলতে পারলে তা দেশের শিল্প, বাণিজ্য, এসএমই, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা কেবল অর্জনই নয়, দীর্ঘমেয়াদে তা ধরে রাখতেও সক্ষম হবে। আইডিআরএ কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে, “IDRA Insurance Excellence Award 2025”–এর আওতায় নির্বাচিত ১৩টি বীমা প্রতিষ্ঠানকে প্রদত্ত এই সম্মাননা বীমা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন, উৎকর্ষতা এবং গ্রাহকআস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.