ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘মহাচুক্তি’, সম্মিলিত বাজারমূল্য ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যে চুক্তিকে দুপক্ষই ‘মহাচুক্তি’ (মাদার অব অল ডিলস) হিসেবে অভিহিত করেছে।

মঙ্গলবার ঘোষিত এই চুক্তিটি প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ ও ধারাবাহিক আলোচনার ফল। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ভূ-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই এই ঐকমত্যে পৌঁছাল দুই পক্ষ।

ভারত ও ২৭ জাতির এই ইইউ জোটের মধ্যকার চুক্তিটি প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজারকে যুক্ত করেছে। এটি বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২৫ শতাংশ এবং যার সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সোমবার নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে সম্মানিত অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যোগ দেন।

ভারত-ইইউ সম্মেলনের আগে মঙ্গলবার ভার্চ্যুয়ালি এক জ্বালানি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের মানুষের জন্য বিশাল সুযোগ বয়ে আনবে।”

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন লিখেছেন, “ইউরোপ ও ভারত আজ ইতিহাস গড়ছে। আমরা ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করেছি, যা উভয় পক্ষকেই লাভবান করবে। আমরা আমাদের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলব।”

এই চুক্তির ফলে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে বিদ্যমান শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু কী আছে এই চুক্তিতে? আর ট্রাম্পই বা একে কীভাবে নেবেন? রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখায় গত বছর ভারতের ওপর শাস্তিস্বরূপ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি।

এই চুক্তির আওতা কতটুকু এবং এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইইউয়ের কাস্টমস ইউনিয়নের পণ্য, সেবা ও বিনিয়োগ—সবই এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। এটি ভারতের এ যাবৎকালের বৃহত্তম ও সবচেয়ে বিস্তৃত বাণিজ্যিক চুক্তি।

২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ভারতের জন্য তাদের জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়, যার ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা উচ্চ শুল্কের মুখে পড়েন। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এই চুক্তির ফলে বস্ত্র, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মতো বেশ কিছু খাতে ভারত বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ১৪৪টি উপ-খাতে ভারতকে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। বিপরীতে ভারতও ইইউ-এর জন্য তাদের আর্থিক সেবা, সমুদ্রবন্দর এবং টেলিযোগাযোগসহ ১০২টি উপ-খাত উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বস্ত্র, রত্ন ও অলঙ্কার শিল্পের শ্রমিক এবং ব্যবসায়িক নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “এই চুক্তি আপনাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক বলে প্রমাণিত হবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এটি কেবল ভারতের উৎপাদন খাতকেই চাঙ্গা করবে না, বরং সেবা খাতেরও প্রসার ঘটাবে।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, “এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বিশ্বের প্রতিটি ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীর কাছে ভারতের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে। ভারত সব খাতেই বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ওপর ব্যাপকভাবে কাজ করছে।”

একাধিক বাণিজ্য আলোচনায় যুক্ত থাকা অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর গণমাধ্যমকে বলেন, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়াটি এখনো ব্রাসেলস ও নয়াদিল্লিতে আইনি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এটি আগামী বছরের আগে কার্যকর না-ও হতে পারে।

আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটগুলো নিয়ে অভিজ্ঞ সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত এই চুক্তিকে ‘চমৎকার’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সামলে পেশাদার উপায়ে বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে।”

বিশ্বজিৎ ধর বলেন, “ভারত ও ইইউ—উভয় পক্ষের জন্যই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি। এটি ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।”

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.