‘বাংলাদেশে প্রবেশে আগ্রহী পেপ্যাল, মার্কিন শুল্ক কিছুটা ছাড়ের ইঙ্গিত’

বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বহুজাতিক আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পেপ্যাল। তবে নতুন কোনো বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ ও ধাপে ধাপে অনুসরণযোগ্য প্রক্রিয়া থাকায় এতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।

মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) সম্মেলনে তার বিভিন্ন বৈঠক ও কার্যক্রম নিয়ে গণমাধ্যমকে ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ডব্লিউইএফের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে তিনি পেপ্যালের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। নীতিগতভাবে পেপ্যাল এখন বাংলাদেশে প্রবেশে আগ্রহী। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই আগ্রহকে তাৎক্ষণিক প্রবেশ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না, কারণ নতুন বাজারে প্রবেশের আগে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও পেপ্যালের মধ্যে আলোচনা বহু বছর ধরেই চলছিল। তবে বিভিন্ন কারণে আগে প্রতিষ্ঠানটি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী ছিল না। তার পক্ষ থেকে কয়েক মাস ধরে বারবার অনুরোধের পর গত ডিসেম্বর পেপ্যালের একটি জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। ওই দল চার থেকে পাঁচ দিন ধরে দেশের উদ্যোক্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।

লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, এই প্রথম আমি পেপ্যালের সঙ্গে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছি। প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহী হলেও এখন তারা অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শুরু করবে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পেপ্যালের ভেতরে আলোচনা, বিতর্ক এবং পরিচালনা পর্ষদ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। এসব শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে পেপ্যাল আসছে- এমন কোনো ধারণা তৈরি করতে চায় না প্রতিষ্ঠানটি।

তবে নিজের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরে তিনি বলেন, পেপ্যাল বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত। বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল, তবে বর্তমানে সুশাসনের উন্নতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির আস্থা আরও বেড়েছে।

ডব্লিউইএফ সম্মেলনে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, দাভোসে তিনি মন্ত্রী বা সরকারপ্রধান পর্যায়ের ১৮ থেকে ২০টি পূর্বনির্ধারিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং নরওয়ের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্গে ব্রেন্ডের আমন্ত্রণে তিনি একাধিক বেসরকারি রাউন্ডটেবিল আলোচনায়ও অংশ নেন, যার মধ্যে পাঁচটি রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি তিনি তিনটি উন্মুক্ত প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন। সব ধরনের বৈঠক ও আলোচনায় বাংলাদেশ সুযোগসন্ধানী হলেও কৌশলগতভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির অগ্রাধিকার তুলে ধরেছে।

ডব্লিউইএফ সম্মেলনের ফাঁকে তিনি সৌদি আরবের মন্ত্রী, মিসরের পর্যটনমন্ত্রী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য স্কট বেসেন্ট, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আদানম গেব্রেয়েসুস, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক অ্যামি পোপ, আঙ্কটাডের মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যান, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ, যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাথন পাওয়েল, মানব পাচার বিষয়ক গ্লোবাল কমিশনের চেয়ার থেরেসা মে, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির প্রধান নির্বাহী ডেভিড মিলিব্যান্ড এবং থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলঙ্কা ও ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) নিয়ে আলোচনা। অশুল্ক বাধা, ব্যবসা সহজীকরণ, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা-এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচির ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ দ্রুত অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে বলে জানান তিনি। একপর্যায়ে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে বলেও জানান লুৎফে সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, কারিগরি অগ্রগতি স্বীকৃতি পেলেও যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে মনোযোগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকে। বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে বর্তমান ২০ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফে কিছুটা ছাড় এবং খাতভিত্তিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সপ্তাহের শেষ দিকে বা পরের সপ্তাহের শুরুতে আসতে পারে। এই অগ্রগতি বাংলাদেশের সমন্বিত অর্থনৈতিক কূটনীতির কার্যকারিতারই প্রতিফলন।

শ্রম সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পাচ্ছে। শুধু সংস্কারের বিষয়বস্তু নয়, বরং যেভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেটিও প্রশংসিত হচ্ছে। বাসস

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.