বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে দেশটির এক কূটনীতিক এ কথা জানিয়েছেন। তাদের এ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে এ বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। তবে নিরাপত্তার ‘স্বার্থে’ ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করেনি সংবাদ মাধ্যমটি।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে এক সময়ে নিষিদ্ধ থাকা দলটি তাদের ইতিহাসের সেরা ফল পেতে পারে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এমন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দলটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা সম্পৃক্ততা বাড়ানোর কথা ভাবছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সর্বশেষবার দলটি নিষিদ্ধ ছিল। ২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। তাঁর শাসনামলকে অনেকেই কঠোর ও দমনমূলক বলে বর্ণনা করেন।
জামায়াতে ইসলামী ঐতিহ্যগতভাবে শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেছে। একসময় নারীদের কাজের সময় কমিয়ে সন্তান পালনের দায়িত্বে বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথাও বলেছিল দলটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলটি নিজেদের অবস্থান কিছুটা নরম করার চেষ্টা করছে এবং বলছে — এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাতে থাকায় ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকরা বার্তা দিচ্ছেন, তাঁরা আবার মাথাচাড়া দেওয়া এই ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বন্ধ দরজা বৈঠকে এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘আরও ইসলামমুখী’ হয়ে উঠছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ফলাফল হবে ‘এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো’। অডিও রেকর্ডিংয়ে এসব কথা শোনা যায়।
ওই বৈঠকে কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।’ এরপর তিনি সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করেন, তাঁদের অনুষ্ঠানে জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের আনা যায় কি না। বলেন, ‘আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনার শো-তে আসবে?’
ওই কূটনীতিক এ–ও বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশে জোর করে শরিয়া আইন চাপিয়ে দেবে — এমন আশঙ্কা তিনি করেন না। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চাপ প্রয়োগের যথেষ্ট উপায় আছে। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না, জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দিতে পারবে।’ যোগ করেন, জামায়াত নেতৃত্ব যদি উদ্বেগ তৈরি করার মতো কিছু করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘পরদিনই তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসাতে পারে।’
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শি এক বিবৃতিতে বলেন, ডিসেম্বরের ওই আলোচনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে একটি নিয়মিত, অফ-দ্য-রেকর্ড বৈঠক। সেখানে একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রসঙ্গ এসেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না এবং বাংলাদেশের জনগণ যে সরকার নির্বাচিত করবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করবে।
জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, ‘একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে কী বলা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।’
আল জাজিরার বিশ্লেষণ: জামায়াতের উত্থান নাকি বিএনপির প্রত্যাবর্তন?আল জাজিরার বিশ্লেষণ: জামায়াতের উত্থান নাকি বিএনপির প্রত্যাবর্তন?
এর আগে প্রকাশ না হওয়া এই মন্তব্যগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন কূটনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট করে। শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। আসন্ন নির্বাচনকে অনেকেই বাংলাদেশের দীর্ঘ অস্থিরতার পর একটি গণতান্ত্রিক মোড় হিসেবে দেখছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই যোগাযোগ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি বলেন, ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এমনিতেই নানা ইস্যুতে চাপে আছে — পাকিস্তান–সংঘাত, রুশ তেল কেনা, বাণিজ্য চুক্তি ঝুলে থাকা এবং ভারতীয় পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ এর মধ্যে রয়েছে।
কুগেলম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বহু বছর ধরেই জামায়াত।’ ভারতের চোখে দলটি পাকিস্তানঘেঁষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
তবে মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্কে ‘গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রভাব ফেলবে না’। তাঁর ভাষায়, ওয়াশিংটন ও ঢাকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.