ট্রান্সকমের ৩ জনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা

ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সিইও সিমিন রহমানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে এই পরোয়ানা জারি করেন। সিমিন রহমান বাদে পরোয়ানা জারি হওয়া অপর দু’জন হলেন- লতিফুর রহমানের স্ত্রী শাহনাজ রহমান ও ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক সামসুজ্জামান পাটোয়ারী।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মোক্তার হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। অভিযোগপত্র দেওয়া ছয় আসামির মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক ও আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের আইনজীবী মনির হোসেন স্থায়ী জামিন চেয়ে আবেদন করেন। আদালত তা মঞ্জুর করেন। সিমিন রহমানসহ তিন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়

২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক বাদী গুলশান থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে সিমিন রহমানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ২০২০ সালের ১৬ জুন ট্রান্সকম গ্রুপের বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায়। মিটিংয়ের এজেন্ডা ছিল পূর্বের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুমোদন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মিটিংয়ে অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক সিগনেচারের অনুমোদন এবং লতিফুর রহমান কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে অনুমোদন। এই মিটিংয়ে হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হয়েছে।

হাজিরা শিটে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও ওই সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করেন। এই বোর্ড মিটিংয়ে তৃতীয় এজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে তার বড় মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি, ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে চার হাজার ৭২০টি করে শেয়ারসহ সর্বমোট ২৩ হাজার ৬০০টি শেয়ার হস্তান্তর করা হয়।

মিটিংয়ের বিষয়ে বাদী দাবি করেন, এই ধরণের বোর্ড মিটিং ১৩ জুন অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে কোম্পানির বর্তমান পরিচালককে ১৩ জুন বোর্ড মিটিং ও রেগুলেশনের কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য বলা হলে আসামিপক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া তদন্তে বোর্ড মিটিংয়ের আগে কোনও ই-মেইল অথবা ডাকযোগে কোনও নোটিশ বা চিঠির কপি পাওয়া যায়নি।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৩ জুন ট্রান্সকম লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়। ১৭ জুন শেয়ার হস্তান্তর হলেও আরজেএসসি নিয়ম অনুযায়ী শেয়ার হস্তান্তরের ফি পরিশোধ না করে ২ সেপ্টেম্বর সেই ফি দেওয়া হয়। এই জমা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে। শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা কোনও পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না।

হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে শেয়ার গ্রহীতা অর্থাৎ আসামিদের পক্ষে শুধু অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে, শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা উভয়পক্ষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে আরজেএসসির প্রতিনিধির সম্মুখে স্বাক্ষর করা। এছাড়া ২০২০ সালে ভাই-বোনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে বেশিরভাগ শেয়ার নিজের নামে নেওয়ার জন্য সিমিন গ্রুপ অব কোম্পানির নথিপত্র ও পারিবারিক ডিড অব সেটেলমেন্ট তৈরি করেন। এ জন্য সিমিন রহমান দুটি ভুয়া স্ট্যাম্প এফিডেভিট ব্যবহার করে সেখানে ছোট বোন শাযরেহ হকসহ বাবা, ভাই ও অন্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর ব্যবহার করে ট্রান্সকমের বেশিরভাগ শেয়ার ট্রান্সফারের দলিল তৈরি করেন। পরে সেগুলো আরজেএসসিতে দাখিল করেন সিমিন।

শাযরেহ হকের নামে আরজেএসসিতে সিমিনের করা এফিডেভিটের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে সৃজনকৃত বলে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

চার্জশিটে আরও বলা হয়, জাল সন্দেহ হওয়ায় দুটি স্ট্যাম্পের সত্যতা নিয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিবেদন চান আদালত। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ভেন্ডর থেকে এই স্ট্যাম্প দুটি সরবরাহের তথ্য রয়েছে, ওই ভেন্ডরের লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল করা হয়। তিনি ২০২৩ সালের স্ট্যাম্পকে অসদুপায়ে সংগ্রহ করে আসামিপক্ষকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ নিজ স্বাক্ষরে সরবরাহ করেন।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.