বিশ্ববাজারে সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে একের পর এক রেকর্ড। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দফায় দফায় দাম বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এক আউন্স সোনার দাম প্রথমবারের মতো ৪ হাজার ৭০০ ডলারে ছাড়িয়ে গেছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কার মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনীতিতে ধীরগতির আশঙ্কা, বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত এবং ডলারের ওঠানামা সোনার বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। এরই মধ্যে চলতি বছরে দেশের বাজারে কয়েক দফা সোনার দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বর্তমানে দেশের বাজারে সোনা সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে।
গতকাল ঘোষণা দিয়ে আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) থেকে দেশের বাজারে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবচেয়ে ভালো মানের সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৯ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ৪ হাজার ২৪ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ২৪ হাজার ৩১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ৩ হাজার ৪৪১ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনায় ২ হাজার ৯১৬ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ১৪৭ টাকা। দেশের বাজারে এটিই এখন পর্যন্ত সোনার সর্বোচ্চ দাম। বর্তমানে এই দামেই সোনা বিক্রি হচ্ছে।
তবে শিগগির এই রেকর্ড ভেঙে সোনার দামে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বাজুসের এক সদস্য বলেন, বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়েই চলেছে। যেভাবে দাম বাড়ছে এবার এক আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলার হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এরই মধ্যে সোনার আউন্স ৪ হাজার ৭০০ ডলার হয়ে গেছে। এভাবে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও দাম বাড়াতে হবে।
বিশ্ববাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টি ১০ মিনিটের দিকে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩৫ দশমিক শূন্য ৩ ডলার বেড়ে ৪ হাজার ৭১২ দশমিক ৮৪ ডলারে উঠে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৮০ সালে এক আউন্স সোনার দাম ৮৫০ ডলার ছিল। এরপর ২০০৮ সালে এক আউন্স সোনার দাম ৮৬৫ ডলারে ওঠে। আর ২০১১ সালে নতুন রেকর্ড গড়ে এক আউন্স সোনার দাম ১ হাজার ৯১৩ ডলার পর্যন্ত ওঠে। এরপর কয়েক দফায় দাম বেড়ে ২০২৫ সালের মার্চে এক আউন্স সোনার দাম প্রথমবার ৩ হাজার ডলার স্পর্শ করে।
অবশ্য এই রেকর্ড গড়ে থেমে থাকেনি সোনার দাম। ২০২৫ সালে কয়েক দফায় সোনার সর্বোচ্চ দামের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রতি আউন্স সোনা ৩ হাজার ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। অক্টোবর মাসে প্রথমবার প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ডলারের মাইল ফলক স্পর্শ করে। ২০২৫ সালের শেষদিকে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৫৫০ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে।
২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে সোনার দাম যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে, দেশের বাজারেও তেমনি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। বছরটিতে সোনার দাম ৯০ বার পরিবর্তন হয়। এর মধ্যে দাম বাড়ে ৬৩ বার এবং কমে ২৭ বার। এতে এক বছরের মধ্যে এক ভরি সোনার দাম ৮৮ হাজার ৬৩৫ টাকা বা ৬৪ শতাংশ বেড়ে যায়। সোনার সর্বোচ্চ দামের ক্ষেত্রে হয়েছে একের পর এক রেকর্ড।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০০ সালে বাংলাদেশে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ছিল ৬ হাজার ৯০০ টাকা। এরপর কয়েক দফা বেড়ে ২০১০ সালে ৪২ হাজার ১৬৫ টাকায় ওঠে। দেশে এক ভরি সোনার দাম প্রথম ৫০ হাজার টাকা হয় ২০১৮ সালে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এক ভরি সোনার দাম ৬০ হাজার ৩৬১ টাকা হয়।
দেশের বাজারে এক ভরি সোনার দাম প্রথম এক লাখ টাকা হয় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে। আর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ভরি সোনার দাম প্রথমবার ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মাইলফলক স্পর্শ করে। দেশের বাজারে ভালো মানের সোনার দাম প্রথম দুই লাখ টাকা স্পর্শ করে গত বছরের ৭ অক্টোবর। এরপর আরও কয়েক দফা সোনার দাম বাড়ানো হয়। এমনকি বছরের শেষ সময়ে এসে টানা পাঁচবার সোনার দাম বাড়ানো হয়। এতে বছরটিতে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকা পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়ায়।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.