সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি বাংলাদেশের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, শুধুমাত্র নীতিমালা, কাঠামো কিংবা মূল্যবোধের কথা বলে দেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এ জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আগামী সরকারের জন্য নির্বাচিত নীতি সুপারিশ ও প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিস্টিংগুইশড ফেলো মুস্তাফিজুর রহমানসহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, অনেক বেশি সক্ষম। এই সচেতন ও সক্ষম নাগরিক সমাজ আগামী দিনে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বুঝেছি শুধুমাত্র পরামর্শ প্রদান করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং সেই পরামর্শ বাস্তবায়নে নজরদারি ও জবাবদিহিতার ভেতর রাখতে হয়। সে জন্য রিফর্ম ট্র্যাকারস উপস্থাপন করেছি। আমরা যেগুলো পরামর্শ দিচ্ছি তার বাস্তবায়ন কী আমরা দেখবো, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার প্রতিফলন করেছে বা করেনি; যেগুলো নিয়ে কথা বলেছি। সেগুলো নজরদারির মধ্যে রাখবো।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা বা নীতিগত বক্তব্য দিলেই তা বাস্তবে রূপ নেয় না। নীতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও কর্মসূচি থাকতে হবে। সে কারণেই নাগরিক প্ল্যাটফর্ম খাতভিত্তিক নীতির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। তবে শুধু নীতিকথা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার প্রথমবারের মতো আমরা বেশ কিছু জাতীয় কর্মসূচি সামনে আনছি, যেগুলো এসব নীতির বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
ব্রিফিংয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা প্রতিটি পরিবারকে মাসে ৪,৫৪০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ইউনিভার্সাল মিনিমাম ইনকাম কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানানো হয়।
প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রস্তাবিত নগদ সহায়তা কর্মসূচিটি তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে দারিদ্র্যপ্রবণ ১১টি জেলার ২৮ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ৩৬টি জেলার ৮০ লাখ পরিবারকে আওতায় আনা হবে। চূড়ান্ত ধাপে দেশের মোট ১ কোটি ৪৭ লাখ দরিদ্র পরিবারকে এই সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বচ্ছতা ও সঠিক উপকারভোগী নিশ্চিত করতে প্রতি দুই বছর অন্তর পভার্টি স্কোরকার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা হালনাগাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্ল্যাটফর্মের হিসাব অনুযায়ী, ৩৬টি জেলায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ০.৭৩ শতাংশ।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্ল্যাটফর্মের পক্ষে প্রস্তাবনার বিস্তারিত তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক তোফিকুল ইসলাম খান। কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আরও পিছিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বলয় অত্যন্ত জরুরি।
নগদ সহায়তার পাশাপাশি আসন্ন সরকারের জন্য একটি ১০ দফা সুপারিশমালা উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সার্বজনীন মিড-ডে মিল চালু করে অপুষ্টি ও ঝরে পড়া রোধ, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য যুব ক্রেডিট কার্ড চালু করে সহজ ঋণ সুবিধা প্রদান এবং জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড ও কৃষক স্মার্ট কার্ড প্রবর্তন ইত্যাদি।
জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ডের আওতায় প্রতি পরিবার বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপে বয়স্ক ভাতা পাওয়া ৬১ লাখ প্রবীণ নাগরিককে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ শতাংশ।
এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত যুবকদের জন্য সুদ ও জামানতবিহীন বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে যুব ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে। দেশের সব প্রকৃত কৃষকের জন্য স্মার্ট কার্ড চালুর সুপারিশ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কৃষি ভর্তুকি ও ডিজিটাল কৃষি সেবা প্রদান করা হবে। প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক তোফিকুল ইসলাম খান জানান, সরকারের বিদ্যমান ‘পার্টনার’ প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং এ জন্য অতিরিক্ত কোনো বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না। বর্তমানে ডিজিটাল কৃষি সম্প্রসারণ ও ই-ভাউচার ভর্তুকিতে বার্ষিক বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.