পাট শিল্পে বৃহৎ বিনিয়োগে চীনের গভীর আগ্রহ: প্রেস সচিব

বাংলাদেশের পাট শিল্পে বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগে চীন আগ্রহী বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, পাট শিল্পে বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় এ খাতকে কেন্দ্র করে চীনা উদ্যোক্তারা কাঁচা পাট থেকে প্রস্তুত পাটপণ্য—সব ক্ষেত্রেই যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও আধুনিক উৎপাদন সুবিধা গড়তে চাচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতি আসবে।

তিনি ‘কৃষি ও খাদ্যে বিনিয়োগ: প্রক্রিয়াজাত পণ্য বাণিজ্যিকীকরণ ভ্যালুচেইন গঠন’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।

প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, পাট বৈচিত্র্যকরণে কথায় অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবে তা দৃশ্যমান নয়। কারণ পাট পচানোর কষ্টকর পদ্ধতি আগ্রহ কমিয়েছে। চীনা বিনিয়োগকারীরা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এক মিলিয়ন টন পাট প্রক্রিয়াকরণ, জৈবসার, জ্বালানি ও সাশ্রয়ী প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরির পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, সঠিক প্রযুক্তি যুক্ত হলে পাট আবারও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান নিতে পারে। কৃষিই আমাদের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর সবচেয়ে ভয়াবহ বছর ছিল ১৯৭৪। ড. নামি হোসেনের গবেষণা উদ্ধৃত করে বলেন, সে সময় প্রায় ১৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। দুর্বল রিজার্ভ, বৈশ্বিক বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা, খাদ্য মজুতদারি ও অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষকে তীব্রতর করেছিল। তিনি জানান, বর্তমানে খাদ্য ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ছয় থেকে আট মিলিয়ন টন আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা খাদ্য আমদানিকে কঠিন করে তুলছে। তাই শক্তিশালী রিজার্ভ, পর্যাপ্ত মজুত ও দ্রুত আমদানির সক্ষমতা জরুরি।

উৎপাদন ও মজুত
প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন—বাংলাদেশকে নেদারল্যান্ডসের মতো প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে এগোতে হবে। তিনি বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়লেই চলবে না, ক্ষুদ্র কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিটি গ্রামে হিমাগার ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে ২০ লাখ টন শস্য সংরক্ষণ করা হয়—এটি বাড়িয়ে ৫০ লাখ টনে উন্নীত করার প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জমির চাপ বিবেচনায় নতুন জাত, নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণায় জোর দিতে হবে।

কৃষিজমি রক্ষা
প্রেস সচিব শফিকুল আলম আবাসন বিস্তারে কৃষিজমি নষ্ট হওয়ার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, গ্রামের বাড়িঘর ফাঁকা পড়লেও কৃষিজমি কমে যাচ্ছে—এটি মোকাবিলায় পরিকল্পিত গ্রাম উন্নয়ন প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ কৃষির বাইরে নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও কৃষক সুরক্ষা—এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।

বিপণনব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা
সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, উৎপাদন বাড়লেও বাজারসংযোগ দুর্বল থাকায় কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। গ্যাপভিত্তিক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডি গঠন ও বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

ড. মো. মাহবুবুল আলম জানান, দেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হচ্ছে এবং নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ৬০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বড় সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রবন্ধ উপস্থাপনে মো. বায়েজিদ বোস্তামী বলেন, পাঁচটি কৃষিপণ্যের ভ্যালুচেইন শক্তিশালী করতে ম্যাপস ও উপজেলা পর্যায়ে সংগঠন গঠন করা হয়েছে—যা উৎপাদক থেকে বাজার পর্যন্ত সংযোগ জোরদার করবে।

চারজনকে সম্মাননা
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, রেজাউল করিম সিদ্দিক, গোলাম ইফতেখার মাহমুদ এবং সাহানোয়ার সাঈদ শাহীনকে সম্মাননা দেওয়া হয়।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.