দেশের অর্থনীতির ভাগ্য-নীতি দুটোই খারাপ

অর্থনীতি ভালো রাখতে হলে ভালো নীতির পাশাপাশি ভাগ্যও ভালো থাকতে হয়। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে দুটোই এখন খারাপ। খারাপ নীতি ও খারাপ সময় দুটোই একসঙ্গে চলছে। প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এমন মন্তব্য করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।

আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেন, অপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যে সাধারণত শুল্কায়ন করা হয় না। সরকারের উদ্দেশ্য ন্যায্যমূল্যে মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া। এরপরও যদি এমন কোনো খাদ্যে শুল্কায়ন করা হয়, তবে তা নমনীয় করা যৌক্তিক হবে।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন বলেছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি বৃদ্ধির কারণ রহস্যময়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কেন বাড়ছে, তার সদুত্তর পাওয়া দরকার। তিনি মনে করেন, ‘মূল্যস্ফীতিকে যদি আমরা প্রধান শত্রু মনে করি, তবে তা নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত বাজেট আরও ছোট করার সুযোগ ছিল। পোলট্রি, মৎস্য, পশুসম্পদ খাতেও শুল্ক কমিয়ে খরচ কমানোর সুযোগ আছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কেন বৃদ্ধির শীর্ষে, সেটা এখনো রহস্যময়।’

অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘ঘোষিত বাজেট দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনের শাসন নিশ্চিত করাও জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পণ্যমূল্য নিয়ে ছয়-সাতজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে সভা করেন, তাঁরাই আবার পণ্যের দাম বাড়ান।’

বিনায়ক সেন বলেন, ব্যাংকে টাকা রেখে আমানতকারীরা এখনো যে সুদ পাচ্ছেন, তা মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে কম। পাশাপাশি নানা ধরনের মাশুল তো আছেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় চাহিদা বাড়াতে হবে। এ জন্য স্থানীয় উৎপাদনও বাড়াতে হবে। এবারের বাজেট শিল্পবান্ধব বাজেট। বাজেটকে বাস্তবায়নমুখী করতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ এখনো আছে।

মূল প্রবন্ধে এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন রিজার্ভও কমতে থাকে। অর্থনীতি ভালো রাখতে ভালো নীতির সঙ্গে ভাগ্যও ভালো থাকা দরকার। কিন্তু দেশে খারাপ নীতি ও খারাপ সময়—দুটোই একসঙ্গে চলছে। আমাদের খারাপ নীতি ছিল ৬-৯ শতাংশ সুদহার, কর জিডিপির হার কম থাকা ও ডলারের দাম ধরে রাখা। এখন পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেছে। ফলে রপ্তানি সেভাবে বাড়ছে না। প্রবাসী আয়েও ভালো প্রবৃদ্ধি নেই। আর্থিক হিসাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে ভন পায়। অর্থনীতির বর্তমান চিত্র বিনিয়োগকারীদের খারাপ বার্তা দিচ্ছে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতিকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মন্দাবস্থা তৈরি হতে পারে। শিল্পঋণের সুদহার ১৪ শতাংশে উঠলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যাবে। এতে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেটি হলে চাকরি হারাবেন অনেক মানুষ। ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণ বেড়ে মূলধন–ঘাটতি দেখা দিতে পারে। শুল্ক-কর কমিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম ১৫-২০ শতাংশ কমানোর সুযোগ রয়েছে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, আগামী দুই বছর এ খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সেটি হলে এই সময়ে কোনো বিদেশি বিনিয়োগ হবে না। স্থানীয়রাও নতুন বিনিয়োগে যাবেন না। এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র করা সহজ হলেও সঞ্চালনব্যবস্থা করাটা কঠিন। বিদ্যুৎ খাতে এখন আমরা লাল পতাকা দেখতে পাচ্ছি। হঠাৎ করে গ্যাসের বিল দ্বিগুণ হয়ে গেল। ডলার হয়ে গেল ১১৪ টাকা। ব্যাংকঋণের সুদ উঠেছে ১৪ শতাংশে। এসব বিবেচনায় না নিয়ে কোনো নীতি করা হলে তার সুফল পাওয়া যাবে না।’

শামস মাহমুদ আরও বলেন, ব্যাংকঋণের সুদ বৃদ্ধির বড় কারণ এ খাত থেকে টাকা চুরি। এই টাকা চুরির দায় কেন জনগণ নেবে? একদিকে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করহার বাড়ানো হয়েছে। এটা সরকারের বিপরীতমুখী অবস্থান।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.