কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের স্বাধীন মত প্রকাশেও বাধা

বাতিল হওয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ফেরানোর দাবিতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংগঠন অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল এক জরুরী সভা ডেকেছিলো। তবে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ের হুমকিতে পূর্বঘোষিত সভা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে সংগঠনটি।

জানা যায়, নির্বাহী পদে গ্রেড-১, নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক পদের সংখ্যা বৃদ্ধি, পদোন্নতি, বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি বৃদ্ধির দাবিতে পূর্বঘোষিত সভা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল।  বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দাবিসংক্রান্ত সভা না করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার নানা ইশারায় চাপ প্রয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ কাউন্সিলের একাধিক নেতার।

আরও জানা যায়, ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহারের মধ্যস্থায় কর্মকতারদের দাবি বাস্তবায়নে আশ্বস্থ করা হয়েছে।  তবে সংগঠনের নেতাদের শাসানোর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যাপক ক্ষোভ ও টানা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মেজাউল হক বলেন, কর্মকর্তা কর্মচারীদের তো দাবি থাকবেই। এটা প্রশাসনিকভাবেই দেখা হয়। দাবি তো একদিনে পূরণ হয় না।

সংগঠনটির সদস্য এমন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রের সরকারি, সায়ত্বশাসিত এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পদ, বেতন, ও মর্যাদা সুযোগ সুবিধা এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশি ছিল। তখন অনেকে সেইসব চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিতে আসতেন। কিন্তু এই গভর্নর আসার পরে নানা সুযোগ সুবিধা সংকোচিক হচ্ছে। এমনকি ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ছে, শাখা বাড়ছে কিন্তু এসব দেখভালের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পদ পদবি বাড়ছে না। বিশেষ করে গ্রেড-১ পদ, নির্বাহী পরিচালক পদ এবং পরিচালক পদের সংখ্যা বাড়ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে ন্যয় দাবি আদায়ে সভা ডাকা হয়। কিন্তু গভর্নর কর্মকর্তাদের ডেকে শাসিয়েছেন। এমন আচরন বড় ধরণের অপমান। তবে ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহারের মাধ্যমে কথা বলে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস মিলেছে। কিন্তু সেই আশ্বাসে আস্থা না থাকলেও চাকরি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নীরবে সভা স্থগতি করা হয়েছে। এ নিয়ে অনেক ক্ষোভ বিরাজ করছে বলেও জানা গেছে।

আরও জানা গেছে, সম্প্রতি এক যোগে ৫৭ কর্মকর্তা ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ঘাটতিতে হতাশা, চাকরির সুযোগ-সুবিধা কমে আসার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান,  সাম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, প্রতিষ্ঠান, বাহিনীর কর্মকর্তাগণের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাদি বৃদ্ধি পেলেও দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাগণের সুবিধাসমূহ কমছে বা কর্তন করা হচ্ছে। যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাগণের মধ্যে অসন্তষ্টি ও হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে দেশের সময়োপযোগী মুদ্রানীতি প্রণয়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণসহ নানাবিধ জটিল ও বুদ্ধিবৃত্তিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা- কর্মচারীগণ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তারা আরও জানান, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণের পরপর ‘বাংলাদেশ ব্যাংক-কে এপেক্স রেগুলেটরি বডি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা’-কে তাঁর একটি অন্যতম ভিশন হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাগণের ইতোপূর্বে প্রাপ্ত ১ দশমিক ৫ বেসিকের সমান শ্রান্তিবিনোদন ভাতা, ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের রেজাল্টের উপর নির্ভর করে একটা অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট, ট্রেনিং একাডেমির কর্মকর্তাদের ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে প্রাপ্য ভাতা, ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের কর্মকর্তাগণ ট্রেনিং সমাপনান্তে বিদেশে বিশেষ প্রশিক্ষণের সুবিধা, প্রথম নিয়োগের সময় চারটি বা তিনটি প্রথম শ্রেণির জন্য অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট কর্তন বা বাতিল করা হয়েছে। যেকোনো সুবিধা যখন কর্তন করা হয় তখন তা নিশ্চিতভাবেই কর্মকর্তাগণের সন্তুষ্টি ও কর্মস্পৃহাকে অবদমিত করে এবং উল্লিখিত বিষয়গুলো গভর্নর ঘোষিত ভিশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক ও দশম (কর্মকর্তা) গ্রেডে প্রবেশন কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদোন্নতির জন্য প্যানেলভুক্তির ক্ষেত্রে ফিডার পদে চাকরিকাল আড়াই দুই বছর ছিলো। কিন্তু বর্তমান গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৩ সালে এই নীতিমালা পরিবর্তন করে চাকরিকাল ৫ বছর করা হয়। যদিও বিশেষ প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাকরীর বয়স ৪ বছর হয়েছে এমন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে পারবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

অর্থসূচক/এমএইচ

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.