নিরাময় ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে মেডিটেশন

২১ মে বিশ্ব মেডিটেশন দিবস

মস্তিষ্কের ক্ষমতার সাথে মনের শক্তির সংযোগ ঘটিয়ে নিরাময়ের জগতে সূচিত হতে পারে এক অফুরন্ত সম্ভাবনা। বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার ফলাফল এমনটাই বলছে। নিউরোসায়েন্সের অভূতপূর্ব বিকাশে দুর্জ্ঞেয় মস্তিষ্কের শক্তিরহস্য এখন একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে আমাদের সামনে। ক্রমান্বয়ে বোঝা সম্ভব হচ্ছে মস্তিষ্কের বিচিত্র গঠন আর গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে। বিচিত্র এই মস্তিষ্কের গঠনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার মধ্যদিয়ে রোগ নিরাময় ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। আর মস্তিষ্কের ইতিবাচক প্রভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে মেডিটেশন বা ধ্যান। মূলত মেডিটেশনের মাধ্যমেই মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে নিরাময় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় মস্তিষ্কের উপর নানা গবেষণার দিকে খেয়াল করলে।

মস্তিষ্ক নিয়ে নিরন্তর গবেষণায় প্রতিনিয়ত আবিষ্কৃত হচ্ছে এর অভাবনীয় সব ক্ষমতা। এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হলো, মস্তিষ্ক আমাদের রোগপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সংহত ও উজ্জীবিত করে তোলার মাধ্যমে যাবতীয় রোগব্যাধি-জীবাণুর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

নিউইয়র্কের ফেইনস্টেইন ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চের পরিচালক নিউরোসার্জন ও ইমিউনোলজিস্ট ড. কেভিন ট্রেসি বিষয়টি নিয়ে দুই দশক দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। তার মতে, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উদ্দীপ্ত করে তোলার মাধ্যমে রিউমেটয়েড আর্থ্রারাইটিস ও হৃদরোগসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর চিকিৎসায় ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে।

ড. ট্রেসির ভাষ্য, মেডিটেশন এক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তার মতে, মেডিটেশন শরীরের সব স্নায়ুকোষগুলোকে শান্ত সুস্থির অবস্থায় নিয়ে আসে। আমাদের হৃৎস্পন্দনের গতি হয়ে ওঠে স্বাভাবিক। মস্তিষ্ক তখন রোগপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চমৎকারভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যার ফলে রোগব্যাধি, সংক্রমণ ও প্রদাহের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে একটি কার্যকর প্রতিরোধ। এ নিয়ে ড. কেভিন ট্রেসির উচ্ছ্বসিত মন্তব্য- ‘এ পর্যন্ত যত ধরনের বিষয় নিয়ে আমি কাজ করেছি তার মধ্যে সত্যিই এটা সবচেয়ে দারুণ।’

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত মেডিটেশনের ফলে শরীর-মনে যে প্রশান্তি আসে, তাতে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের ভাইরোলজিস্ট ড. রোনাল্ড গ্ল্যাসার। ল্যাবরেটরি টেস্টে তিনি প্রমাণ করেছেন, স্ট্রেস হরমোন নর-এপিনেফ্রিন ক্যান্সার সেলকে উদ্দীপিত করার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্যান্সার ছড়িয়ে দেয়। তার মতে, তাই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফল হতে চাই স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ। আর স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে মেডিটেশনের ভূমিকা এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

মস্তিষ্ক আর মানব মনের বিস্ময়কর নিরাময়শক্তি বিজ্ঞানীদের আরো নিত্যনতুন গবেষণায় উৎসাহী করে তুলছে। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিসহ আরো দুটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এমনই একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। ক্রনিক ব্যথায় ভুগছেন এমন কয়েকজন রোগীকে বিশেষ কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের নিজ নিজ মস্তিষ্কের ছবি দেখানো হয় ও এর কর্মপ্রক্রিয়া সম্বন্ধে একটি ধারণা দেয়া হয়। তারপর তাদের বলা হয়, মস্তিষ্ক তার নিজস্ব নিরাময় প্রক্রিয়ায় ব্যাথা নিরাময় করছে-এ দৃশ্যটি কল্পনা করতে।

গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী ড. সিয়েন ম্যাকি বলেন, ‘পরবর্তীতে দেখা গেছে, এদের অনেকেরই ব্যাথার তীব্রতা শতকরা ৪০ ভাগ পর্যন্ত কমে গেছে।’ তার ভাষায়, ভবিষ্যতে এমন দিন আসছে যখন একজন চিকিৎসক তার রোগীদের কল্পনাশক্তি শাণিত করার পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেবেন যাতে বিষণœতা, বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর আসক্তি ও ভয় থেকে তারা নিজেরাই মুক্ত হতে পারে। তখন হয়তো ফিটনেস সেন্টারের বদলে গড়ে উঠবে ব্রেন-ইমেজিং সেন্টার, যেখানে গিয়ে একজন মানুষ নিজের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে তার দরকারমতো মস্তিষ্কের যেকোনো অংশকে আরো কার্যকর করে তুলতে পারবে। আর এভাবেই সে হয়ে উঠবে অধিকতর দক্ষ, চৌকস, উন্নত স্মৃতিশক্তি ও উচ্চতর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একজন মানুষ।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দশকে মস্তিষ্ক-গবেষণায় এমন বিস্ময়কর সব ফলাফল আমূল বদলে দিচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পুরনো সব ধ্যানধারণা। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের ইন্টিগ্রেটিভ নিউরাল ইমিউন প্রোগ্রামের পরিচালক ড.এস্থার স্টার্নবার্গ বলেন, বিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় মনোদৈহিক নিরাময়ের যে দৃষ্টিভঙ্গিটি এতদিন উপেক্ষিত ছিল, সেটিকেই বুঝি এবার সব কৃতিত্ব দিতে হবে।

প্রশান্তির জন্যে শুধু পরামর্শই নয়, চিকিৎসকরা নিজেরাও এখন মেডিটেশনে মনোযোগ দিয়েছেন। চর্চা করছেন নিয়মিত। ফলও পাচ্ছেন। প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাতে যোগ হচ্ছে মেডিটেশন। কেননা, শারীরিক বা মানসিক উভয়দিকেই ওষুধের পাশাপাশি নিরাময়ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে মেডিটেশনের গুরুত্ব এখন আরো স্পষ্ট, আরো পরিষ্কার।

লেখক: স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. আয়েশা হান্না

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.