ঘুরে দাঁড়ানোর কাছাকাছি বাজার

দারুণ অস্থির সময় পার করছে দেশের পুঁজিবাজার। চলছে টানা দরপতন। সর্বশেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স প্রায় ৭৭ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৮৬ পয়েন্টে নেমে এসেছে। অর্থনীতির কোনো খারাপ খবর না থাকা সত্ত্বেও বাজারে চলছে বিয়ারিশ ট্রেন্ড।

বাজার বিশ্লেষকরা বাজারের এমন আচরণকে অস্বাভাবিক মনে করছেন। তাদের মতে, নানাভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় এমন দর পতন হয়েছে। আবার কোনো কোনো সুযোগসন্ধানী মহল গুজব ছড়িয়ে কম দামে শেয়ার কেনার চেষ্টা করছে। শিগগীরই এমন অবস্থার অবসান ঘটবে। নিজস্ব শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াবে বাজার। ফিরবে স্বাভাবিক ধারায়। সেটি আজ-কালের মধ্যেও শুরু হতে পারে।

জানা গেছে, বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গত সপ্তাহে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে বাজারে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য কিছু কর্মকৌশল ঠিক করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও এ বিষয়ে কাজ করছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল, যা গত ফেব্রুয়ারি মাসে তুলে নেওয়া হয়। আর তার কিছুদিন পরই বাজারে শুরু হয় দরপতন। এদিকে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ফের যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই বিষয়টিকে সামনে রেখে নানা গুজব রটিয়ে পরিস্থিতিকে নাজুক করে তোলার চেষ্টা করতে থাকে। এসব গুজবের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের মনে আবার ফ্লোর প্রাইস আরোপের আশংকার বিষয়টিও রয়েছে, যদিও বাস্তবে তার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক প্রান্তিক আগে দেশে তীব্র ডলার সঙ্কট ছিল। ডলারের বিপরীতে টাকা অনেক দর হারিয়েছিল। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ কারণে অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানির মুনাফা ও শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) বেশ কমে যায়। এ ধরণের পরিস্থিতিতে শেয়ারের মূল্য সমন্বয় হয়। কিন্তু তখন ফ্লোরপ্রাইস থাকায় ওই সমন্বয়টুকু হতে পারেনি বলে ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহারের পর বাজারে সে সমন্বয় ঘটেছে। যদিও এর মধ্যে দেশের ডলার পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিক গতি ফিরছে, কোম্পানিগুলোর ইপিএসও বাড়ছে। তাই এখন শেয়ারের দাম বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে নতুন করে সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ফ্লোর প্রাইসের কারণে যেসব বিনিয়োগকারী জরুরি প্রয়োজনেও বাজার থেকে টাকা নিতে পারেননি, তারা এটি প্রত্যাহারের পর ধীলে ধীরে তুলে নিয়েছেন। এ ধরনের বিক্রির চাপ ও বিনিয়োগ প্রত্যাহারের চাপ আর বাজারে নেই।

অন্যদিকে বাজারে কোনো পরিস্থিতিতেই আর ফ্লোরপ্রাইস আরোপ হবে না  বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে দুটি হামলা-পাল্টা হামলার পর পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে আন্তর্জাতিক মহল যে কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে ইরান ও ইসরায়েল সাড়া দিয়েছে। দেশ দুটি আর উত্তেজনা বাড়াতে চায় না বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এদিকে টানা দর পতনে বাজার প্রায় তলানীতে চলে আসায় এটি এখন বেশ বিনিয়োগ অনুকূল। বাজারের সামগ্রিক মূল্য-আয় অনুপাত এখন সাড়ে ১২। যখনই বাজারের মূল্য আয়-অনুপাত ১৫ এর নিচে নেমে আসে, তখনই সেখান থেকে বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাছাড়া বাজারে বড় বিনিয়োগকারীরা বেশ সক্রিয় আছে। কারণ তীব্র দর পতনের মধ্যেও বাজার ক্রেতা-শূন্য হয়নি। প্রতিটি শেয়ারেরই পর্যাপ্ত ক্রেতা আছে। তাতে বুঝা যায়, কিছু বিনিয়োগকারী আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করলেও, অন্যকিছু বিনিয়োগকারী সাহস করে তা কিনে নিচ্ছেন। বাজারের সম্ভাবনা আছে বলেই তারা এ বিনিয়োগ করছেন।

সব মিলিয়ে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাজার এখন ঘুরে দাঁড়ানোর কাছাকাছি অবস্থান করছে। যে কোনো দিন সেখান থেকে স্বাভাবিক ধারায় বাঁক নেবে বাজার। তাই এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের উচিত বিচক্ষণতার সাথে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.