ব্যাংক খাতের দুরবস্থার মধ্যেও বেড়েছে পরিচালন মুনাফা

বছরজুড়ে দেশের ব্যাংক খাতে রেকর্ড ঋণ খেলাপি। ধারাবাহিকভাবে কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। আশানুরূপ হয়নি আমদানি-রফতানি। ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ আর নানা অনিয়মে দুরবস্থায় রয়েছে ব্যাংক খাত। তারপরও ২০২৩ সাল শেষে দেশের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৭০০ কোটি টাকা। এর আগের বছর মুনাফা হয়েছিলো ১০৬ কোটি টাকা। ঋণ আদায় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এক বছরের ব্যবধানে ৫৯৪ কোটি টাকা বা ৫৬০ শতাংশ পরিচালন মুনাফা বেড়েছে রূপালীর।

আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৩ কোটি টাকা। আগের বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৯২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৩ সালে জনতার পরিচালন মুনাফা বেড়েছে ৯৫ কোটি টাকা।

এদিকে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৭৮১ কোটি টাকায়। ২০২২ সালে ব্যাংকটির মোট পরিচালন মুনাফা ছিল দুই হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ১৩৫ কোটি টাকা।

এছাড়া ২০২৩ সালে ৪৫৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে ইউনিয়ন ব্যাংক। আগের বছর ব্যাংকটির মুনাফ হয়েছিল ৪১৫ কোটি টাকা।

আলোচ্য সময়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের লাভ হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু এক বছর আগে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৫২০ কোটি টাকা। একই সমেয় মেঘনা ব্যাংকের পরিচালর মুনাফা ৭৫ কোটি থেকে ১৬৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

পরিচালন মুনাফাই একটি ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে, তা-ই হচ্ছে পরিচালন মুনাফা। আর পরিচালন মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ, সঞ্চিতি, করপোরেট কর বাদ দিলে যা থাকে, তা-ই হচ্ছে নিট মুনাফা। নিট মুনাফা থেকেই লভ্যাংশ দেয় তালিকাভুক্ত ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ ঋণের ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এটি ২০২২ সালের একই সময়ের চেয়ে ২১ হাজার কোটি টাকা বেশি।

করোনার পর দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক করতে ব্যাংক ঋণে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাপক ছাড় দিয়েছে। একটা সময়ে ২৫ শতাংশ পরিশোধে খেলাপী না করারও নির্দেশ দেয়া হয়। এসব ছাড়ের ফলে অধিকাংশ ব্যাংকই প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করেনি। এখন সেই সুবিধা না থাকলেও গত কয়েকবছরে অনেক খেলাপি ঋণ বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত করা হয়েছে। যার কারণে প্রভিশন রাখতে হয়নি।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ সালে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা উঠিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশে ব্যাংক। বৈদেশিক মু্দ্রার সংকটের মধ্যেও যাদের হাতে ডলার ছিল তারা ভালোই ব্যবসা করেছে। তাই ওইসব ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। তবে যারা ডলার সংকটে তার খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। কারণ তারা এখনও অন্য ব্যাংকের কাছে ডলারের জন্য অনুরোধ করছে।

ব্যাংকগুলোর বর্তমান দুরবস্থার পেছনে মূলত ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং দুর্নীতি-অনিয়ম দায়ী। ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ খাতের সংকট নিরসনে প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বটে, তবে সংকট থেকে সাধারণ পদক্ষেপ নিয়ে উত্তরণ পাওয়া যাবেনা বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থসূচক/মো.সুলাইমান/এমএস

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.