কৃষি ঋণ বিতরণে পুরোপুরি ব্যর্থ দুই ব্যাংক

দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই ধারবাহিকতায় চলতি অর্থবছর ব্যাংকগুলোকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে প্রথম চার মাসে বেসরকারি খাতের সিটিজেন ব্যাংক এবং বিদেশি ওরি ব্যাংক এ খাতে ঋণ বিতরণে পুরোপুরি ব্যর্থতা দেখিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চারমাসে (জুলাই-অক্টোবর) ব্যাংকগুলো ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রা ৩৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। যদিও এই সময়ে বেসরকারি খাতের পদ্মা ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার ৫ শতাংশের কম ঋণ বিতরণ করেছে। আর কোন ঋণ বিতরণ করতে পারেনি বেসরকারি খাতের সিটিজেন ব্যাংক এবং বিদেশি ওরি ব্যাংক।

এদিকে ৫ শতাংশের কম ঋণ বিতরণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫৮ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা থাকা পদ্মা ব্যাংক ৪ মাসে মাত্রা ১৩ লাখ টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে। আর ১৩২ কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্য থাকা মধুমতি ব্যাংক বিতরণ করেছে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা বা লক্ষ্যমাত্রার ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এছাড়া শরীয়া ভিত্তিক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। ব্যাংকটির লক্ষ্য ছিলো২৮৪ কোটি। চার মাসে ব্যাংকটি বিতরণ করেছে ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট কাজে অর্থসরবরাহ নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কমপক্ষে ২ শতাংশ কৃষি ঋণ বিতরণ বাধ্যতামূলক করেছে। যেসব ব্যাংক কৃষি ঋণ বিতরণ করবে না, তাদের জরিমানার ব্যবস্থা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে প্রতিবছরই সাধারণ ঋণ বিতরণের পাশাপাশি বাড়ছে কৃষি ঋণ বিতরণ। এ জন্য বছরের শুরুতে লক্ষ্যও ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে। যাতে বছরের বারো মাস বিশেষ করে ফসল চাষের শুরুতে কৃষকরা সময় মতো ঋণ পান।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে কৃষি ও পল্লি ঋণের মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৩ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলো ৮৪৪ কোটি এবং বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। এই ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে লক্ষ্যমাত্রার ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

কৃষি ঋণ বিতরণের পাশাপাশি কৃষকের ফেরত দেওয়া ঋণের হার সন্তোষজনক। আবার কৃষি ঋণে খেলাপি কৃষকের হারও তুলনামূলক কম। এ ঋণে খেলাপির হারও ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। অক্টোবর শেষে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এ মধ্যে খেলাপির পরিমাণ মাত্র ৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ঋণ নিয়ে কৃষকেরা কখনো জালিয়াতি করেন না। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে সমস্যায় পড়েন তারা। এরপরেও তাদের মধ্যে ঋণ খেলাপির প্রবণতা একেবারেই নেই। তবুও কৃষকদের স্বল্প অর্থের ঋণ আদায়ে বেশি তৎপর ব্যাংকগুলো।

তথ্য বলছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে কৃষি খাতে বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে আদায় হয়েছে ১০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। আর অক্টোবার শেষে এই খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

এই চার মাসের সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। জুলাই-অক্টোবর মাসে মোট ২ হাজার ১৯১ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক ৯৮০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। আলোচ্য চার মাসে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৬৪২ কোটি, ডাচ বাংলা ব্যাংক ৪৮৮ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংক ৪৭৩ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পল্লী ও কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৫৪১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছর ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যমাত্রার ন্যূনতম ১৩ শতাংশ ঋণ মৎস খাতে দিতে হবে। প্রথম চার মাসে এই খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। আর লক্ষ্যমাত্রার অন্তত ১৫ শতাংশ ঋণ দেওয়ার কথা প্রাণিসম্পদ খাতে। আলোচিত সময়ে পশুসম্পদ ও পল্ট্রি খাতে বিতরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ২৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এছাড়া চার মাস শেষে দ্রারিদ্র বিমোচণে ৮২০ কোটি, শস্য খাতে ৫ হাজার ৩৪৭ কোটি, কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৭০ কোটি, সেচ যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৭৫ কোটি, শস্য গুদামজাত ও বিপণন খাতে ৪১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।

দেশের কৃষকদের দেয়া ঋণ সুবিধার বড় অংশই বিতরণ হচ্ছে এনজিওর মাধ্যমে। ব্যাংক থেকে কৃষকরা ঋণ পান সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদে। কিন্তু এনজিওর মাধ্যমে নেয়া ঋণের সুদহার দাঁড়াচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে। প্রান্তিক কৃষকদের কাছে ঋণ পৌঁছার সক্ষমতাই দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক তৈরি করতে পারেনি। এ কারণে ব্যাংকগুলো কৃষি খাতের ঋণের ৫০-৮০ শতাংশ এনজিওকে দিয়ে দিচ্ছে। এনজিওগুলো ব্যাংক থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে দ্বিগুণ-তিন গুণ সুদে বিতরণ করছে।

অর্থসূচক/এমএইচ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.