পুঁজিবাজারে বিনিয়োগঃ করণীয় ও বর্জনীয়

দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে পুঁজিবাজার একটি প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল ও টেকসই রয়েছে কি না তা বোঝার অন্যতম উপায় হচ্ছে পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি খেয়াল করা। তবে একথাও সত্যি যে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশকিছু ঝুঁকি রয়েছে। যেকোনো ব্যবসা বা লেনদেনের ক্ষেত্রে বলা যায়, ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে বিনিয়োগ করলে সেখান থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এজন্য সব সময় কিছু জিনিস মাথায় রেখে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত।

বিনিয়োগকারীর করণীয়-

প্রথমে পুঁজিবাজার ও এর তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানুন
ঝুঁকি এড়িয়ে বিনিয়োগ করতে চাইলে প্রথমেই পুঁজিবাজারের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে নিতে হবে; বিনিয়োগের আগে বিস্তারিত গবেষণা করা আবশ্যক। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী ৬৫৬টি তালিকাভুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিনিয়োগ করার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত বছরগুলোর আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস, পূর্নাঙ্গ আর্থিক বিবরণী ও শেয়ার প্রতি লভ্যাংশ প্রদানের পরিমাণ সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেনের গতিপ্রকৃতি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকতে হবে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী দেশে সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ১৪ লাখেরও বেশি। তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই বাজার থেকে লাভবান হতে চাইলে এই বাজারের খুঁটিনাটি জানতে হবে এবং প্রয়োজনীয় গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।

পুঁজিবাজার সংক্রান্ত নিয়মনীতি এবং নীতিমালা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখুন
পুঁজিবাজারে লেনদেন করতে চাইলে প্রথমেই বিনিয়োগকারীকে একটি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। এই অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে লেনদেন করা সবক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীকে নানা ধরণের নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এছাড়া, পুঁজিবাজারের এমন কিছু নীতিমালা রয়েছে যা তালিকাভুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। ডিএসই (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) ও সিএসই’র (চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ) ওয়েবসাইট ও ব্রোকারেজ হাউজ থেকে এসব নীতিমালা সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জেনে নেয়া যায়। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা অর্থাৎ বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর ওয়েবসাইটে অনেক ক্ষেত্রে এসব নীতিমালা প্রকাশ করে থাকে। অনেক সময় আবার এসব নীতিমালায় পরিবর্তন বা সংশোধন আসতে পারে। সেক্ষেত্রে হালনাগাদ করা নীতিমালা সম্পর্কে খোঁজ রাখতে পত্রপত্রিকার শেয়ারবাজার অংশে নিয়মিত চোখ বুলাতে হবে। পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করার আগেই নীতিমালা সম্পর্কে জেনে নেয়া জরুরি।

যেমন আয়/সঞ্চয়, তেমন বিনিয়োগ
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নিজের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে করা উচিত। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত, সঞ্চয় বা অলস অর্থ থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেন। পাশাপাশি, পুঁজিবাজার সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণ জানাশোনা রাখা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের ওপর গুরুত্ব দেন তারা। একই সাথে, বিনিয়োগে ঝুঁকি কমিয়ে আনতে ঋণ-নির্ভর লেনদেন না করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদার প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিন
নিজস্ব গবেষণার কোনো বিকল্প না থাকলেও, বিনিয়োগকারীর কাজকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক করতে দেশে বেশকিছু ব্রোকারেজ হাউজ গড়ে উঠেছে। লেনদেন সম্পর্কিত সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর দিয়ে সহায়তা করে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা ও লেনদেনের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পরামর্শদাতা হিসেবে এসব ব্রোকারেজ হাউজের সহায়তা গ্রহণ করা যায়। সময়ের সাথে সাথে পুঁজিবাজারে নিরবচ্ছিন্ন লেনদেন নিশ্চিত করতে এখন দেশেও যুগোপযোগী ব্রোকারেজ হাউজ গড়ে উঠেছে। অনেক ব্রোকারহাউজের এখন নিজস্ব অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস) রয়েছে। নিজস্ব ওএমএস থাকলে একটি ব্রোকারেজ হাউজ বিনিয়োগসংক্রান্ত সমস্ত প্রক্রিয়া ও সেবা আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। অনেক ব্রোকারহাউজের নিজস্ব রিসার্চ টিম আছে। সবকিছু দেখেবুঝে একটি ভাল ব্রোকারহাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংকের সহায়তা নিলে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।

বিনিয়োগে বর্জনীয়-

আবেগের বশবর্তী হওয়া যাবে না
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আবেগ একদমই পরিহার করা উচিত। আবেগ থেকে লেনদেন করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচক মনোযোগ এড়িয়ে যেতে পারে। এতে করে বিনিয়োগকারী ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই এই খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্রোকারেজ হাউজগুলো দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকে। রাতারাতি বা স্বল্পমেয়াদে লাভবান হওয়ার চিন্তা থেকে পুঁজিবাজারে লেনদেন করতে চাইলে ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।

গুজব হতে সাবধান
এসবের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। অনেকেই বিভিন্ন সময় গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করতে ও পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় ব্যাঘাত ঘটাতে চেষ্টা করে। গুজব প্রচারকারী চক্র একেক সময় একেক রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে সক্রিয় হয়। গুজবের ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বিশেষ করে, গুজবের ফলে ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারী আকস্মিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ফলে ওই বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। বিনিয়োগকারী হিসেবে এই ধরনের বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে।

দেশের অর্থনীতির টেকসই বিকাশ অনেকটাই পুঁজিবাজারে লেনদেনের ওপর নির্ভর করে। তাই পুরোপুরি জেনে-বুঝে ও ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে তারপরই এই খাতে বিনিয়োগ করা উচিত। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারী লাভবান হতে পারেন, অন্যদিকে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হতে পারে।

লেখক: জোবায়েদ আল মামুন হাসান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এনবিএল সিকিউরিটিজ লিমিটেড

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.