মানসিক স্বাস্থ্যসেবা হোক ভ্যাট মুক্ত

দেশে এখন আলোচনার কেন্দ্র রয়েছে বাজেট। সাথে পদ্মা সেতু উদ্বোধন উৎসব। বাজেট কারো কাছে সেই বিখ্যাত সিনেমার মতো দ্যা গুড (ভালো), দ্যা ব্যাড (মন্দ), দ্যা আগলি (খুব খারাপ)। এই যেমন, এবারের বাজেটকে বলা হচ্ছে- বড়লোকের বাজেট, বা ব্যবসায়ী বান্ধব বাজেট। যেখানে মধ্যবিত্ত বা গরীব পড়বে জিনিসপত্র উচ্চমূল্যের চাপে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও বলেছেন- এ বাজেট নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রফতানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহ আরো অনেক কিছু। বাজেটের প্রচলিত বিষয় নয়, আজ আমরা একটা ভিন্ন বিষয়ে কথা বলবো। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়- মানসিক স্বাস্থ্য ও মেডিটেশন বা ধ্যান। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমাদের প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে এটাই স্বাভাবিক। করোনা কালে সেটা আরো বেশি বাড়াতে হয়েছে। আবার স্বাস্থ্য সেবা সহজ করার জন্য এখানে মূসক বা ভ্যাটও আরোপ করা হয় না। অর্থাৎ ভ্যাট মুক্ত গোটা স্বাস্থ্যখাত।
প্রস্তাবিত বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অন্যতম উপাদান মেডিটেশন বা ধ্যানের ওপর ভ্যাট বা মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগেও বাজেটে এ প্রস্তাব থাকলেও তখন মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বলে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তখন বাজেট বক্তৃতায় মেডিটেশনকে মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভূক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল মহোদয় এবং মরহুম সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত মহোদয়ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য মেডিটেশন সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতির কথা বলেছিলেন। যেহেতু বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা ভ্যাটের আওতামুক্ত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে মেডিটেশন সেবাও ভ্যাটের আওতামুক্ত থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
আমরা যদি উন্নত বিশ্ব বা আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোতে তাকাই তাহলে দেখবো যোগ মেডিটেশন সেবা ভ্যাটের আওতামুক্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, মেডিটেশন চিকিৎসারই অংশ।
এখন আমরা জানব যোগ- ধ্যান বা মেডিটেশন কী? ধ্যান, মেডিটেশন, মোরাকাবা, তাফাক্কুর শব্দগুলো ভিন্ন হলেও মূল নির্যাস একই। বিভিন্ন ধর্ম আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এর ব্যবহার হয়ে আসছে। বলা যায়, প্রাচ্যের হাজার বছরের ঐতিহ্য এই ধ্যান, মোরাকাবা বা মেডিটেশনই এখন পাশ্চাত্যেও জনপ্রিয় হচ্ছে। একসময় সাধু, ঋষি, ওলি-আউলিয়া এবং মহামানবরা নিজেদের এবং সমাজের মানুষের সুস্থতা বা সাধনার জন্য ধ্যান চর্চা করতেন। ধ্যান এখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এমনকি জেলখানায় আসামিদের অপরাধ বা অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বেও মেডিটেশন বা ধ্যান মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
সফল উদ্যোক্তা জেফ ওয়েইনার (লিংকডইন এর সিইও) থেকে শুরু করে সেলিব্রিটি অপরাহ উইনফ্রেহসহ মুখচেনা কর্মযোগী মানুষদের সিংহভাগই এখন কোনো না কোনো ধরনের ধ্যানের অনুশীলনের সাথে জড়িত। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন মেডিটেশন মূল চিকিৎসার অংশ হিসেবে স্বীকৃত। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন একটি গবেষণাপত্র নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে, শিরোনাম ছিল, ‘This Could Cut Your Health Costs by $25000 a Year, Study Finds.’ এই ‘This’ হচ্ছে মেডিটেশন বা ধ্যান।
মনের সার্বজনীন ব্যয়াম হচ্ছে মেডিটেশন বা ধ্যান। মেডিটেশনের নিয়মিত অনুশীলন জাগিয়ে তোলে মানুষের ভেতরের ইতিবাচক সত্ত্বাকে, শুভ শক্তিকে। এর নিয়মিত চর্চায় মনের রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, হাতাশা, মানসিক চাপ দূর হয়। নেতিবাচকতা থেকে ইতিবাচকতায় বদলে যায় দৃষ্টিভঙ্গি। অর্থাৎ মানসিক সুস্থতা থাকলে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মক্ষেত্রে সব কিছুতেই প্রভাব পড়ে। মানুষ হতে হবে সম্পূর্ণ সুস্থ। শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ বা পরিশ্রমে অক্ষম দুর্বল জনগোষ্ঠী কখনো সবল অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না। মানসিক স্বাস্থ্য ছাড়াও মেডিটেশন চর্চায় ব্যাকপেইন, অস্ট্রিওআর্থ্রাইটিস, অনিদ্রা, আইবিএসসহ নানাবিধ অসুস্থতা কমে যায়। ফলে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি কমে, বাড়ে উৎপাদনশীলতা।
আমেরিকার বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ড. ডিন অরনিশ ভয়াবহ হৃদরোগে আক্রান্ত বিল ক্লিনটনের বাইপাস ছাড়া শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং ইয়োগা মেডিটেশনের মাধ্যমে জীবনযাপন চিত্রই পাল্টে দিয়েছিলেন। হালে বারাক ওবামা এখন যাওয়া আসা শুরু করেছেন ডিনের কাছে। ড. ডিন ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণায় হৃদরোগ প্রতিরোধে মেডিটেশনের সফল প্রয়োগ দেখিয়েছেন। বর্তমানে তার www.ornish.com ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, আলঝেইমারসহ বিভিন্ন ক্রনিক রোগ প্রতিরোধে সেবা প্রত্যাশীদের তিনি মেডিটেশন এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে world health organization এবং ব্রাজিলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মেডিটেশনের ব্যবহারিক দিক নিয়ে একটি গবেষণা করে। ২০২১ সালে frontier in public health নামক একটি জার্নালে তা ‘Meditation: Evidence Map of Systematic Reviews’ এই শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পুরো রিপোর্টটি অনেক বড়। সার সংক্ষেপে বলা যায়, ‘মেডিটেশন প্র্যাকটিস প্রত্যেককে আলাদা এবং সামাজিকভাবে মানুষকে শারীরিক মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলে। যাদের ক্রনিক রোগ ও বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতা রয়েছে; তারা এই অভ্যাসের মাধ্যমে উপকৃত হবেন। আর ধ্যানের এই প্র্যাকটিস জনস্বাস্থের জন্যে একটি ভালো কৌশল।’
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত মেডিটেশন ইয়োগা মূল চিকিৎসার অংশ করে নিয়ে কর অব্যাহতি দিয়েছে। এবং শিক্ষাক্ষেত্রে একটি সংস্কার আনার প্রয়াসে দিল্লী সরকার রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়গুলেোতে একটি ‘সুখী পাঠ্যক্রম’ চালু করেছে। পাঠ্যক্রমটিতে প্রতিটি শ্রেণীর আগে ৪৫ মিনিট এবং পাঁচ মিনিটের ধ্যানের একটি সুখের সময় জড়িত। ৪০ জন বিশেষজ্ঞের একটি দল পাঠ্যক্রম তৈরি করেছে, যার মধ্যে ধ্যান, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানসিক অনুশীলন রয়েছে। সরকারের মতে, নতুন পদক্ষেপটি হলো আধুনিককেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয় যেমন- সন্ত্রাসবাদ, দুর্নীতি ও দূষণ; মানবকেন্দ্রিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাধান করার প্রচেষ্টা।
ধ্যানের ইতিহাস: প্রাচীন মানুষ যে যোগ-ধ্যান বা মেডিটেশন চর্চা করতেন তার লিখিত প্রমাণের বয়সই কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর। ৫ হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় তন্ত্রশাস্ত্রে ধ্যানের উল্লেখ আছে। এটি সতের শতকের একটি দুর্লভ উপনিষদ পান্ডুলিপির খণ্ডাংশ। এখানে ধ্যানের কথা বলা আছে।
মোজেস বা মুসা: ইহুদি ধর্মের প্রাণপুরুষ মোজেস বা মুসা সিনাই পাহাড়ে ৪০ দিন ধ্যানমগ্ন থেকে আল্লাহর বাণী লাভ করেন। তাওরাতে পিতা আইজ্যাকের সান্ধ্যকালীন প্রার্থনার জন্যে মাঠে যাওয়া প্রসঙ্গে হিব্রুতে যে ‘লাসাচ’ (Lasuach) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, এটা আসলে ধ্যানেরই একটি পরিভাষা।
মহেঞ্জোদারো সভ্যতা: ধ্যানচর্চার প্রাচীন ইতিহাসের আরো কিছু নিদর্শন মিলেছে মহেঞ্জোদারো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে। আজ থেকে ৪৬০০ বছর আগে সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলে বিকশিত এ সভ্যতার একটি প্রাচীন সিলমোহরে দেখা যায় ধ্যানাসনে বসে একজন যোগী গভীর ধ্যানে মগ্ন।
মহামতি বুদ্ধ: মহামতি বুদ্ধ ধ্যানের পথে বোধি লাভ করেছেন। ধ্যানের মাধ্যমেই নির্বাণ লাভের পন্থা শিখিয়েছেন অনুসারীদের। তাঁর ধ্যান পদ্ধতিকে ইউরোপ-আমেরিকায় এখন নানাভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে বিভিন্ন শারীরিক-মানসিক নিরাময়ের ক্ষেত্রে।
যিশু: যিশুখ্রিষ্টের জীবনে ধ্যান এবং প্রার্থনা হয়ে গিয়েছিল একাকার। যখনই সুযোগ পেতেন তিনি ধ্যান ও প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকতেন। শিষ্যদেরও উৎসাহিত করতেন ধ্যানমগ্ন হতে।
হযরত মোহাম্মদ (সা.): মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স) বছরের পর বছর হেরা গুহায় কাটিয়েছেন ধ্যানমগ্ন অবস্থায়। ধ্যানের স্তরেই পবিত্র কোরআনের বাণী নাযিল হয়েছে তাঁর ওপর।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান: অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। আজ থেকে হাজার বছর আগে বাংলার এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ধ্যানের শিক্ষা দিয়ে উপমহাদেশ, তিববত ও চীনের সমাজ-জীবনের পঙ্কিলতা দূর করতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
ইমাম গাজ্জালী: ইমাম গাজ্জালী। দীর্ঘ ১০ বছর নির্জনবাসের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেন আত্মশুদ্ধি এবং ধ্যানের পথেই মুক্তি। শরিয়তের সাথে সাধনাকে সম্পৃক্ত করে তিনি ইসলামি জীবনদৃষ্টির পুনর্জাগরণ ঘটান। পরবর্তী হাজার বছরে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সাধক-দার্শনিকদের তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তার লেখা থেকেই পাওয়া যায় যে, হযরত ইমাম বোখারীও মেডিটেশন করতেন।
হযরত মওলানা জালালুদ্দিন রুমি: বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী কবি দার্শনিক হযরত মওলানা জালালুদ্দিন রুমি। তিনি মোরাকাবায় নতুন মাত্রা যোগ করেন নৃত্য সংযোজন করে। তাঁর স্রষ্টায় সমর্পণ এবং বিশ্বজনীন প্রেমের দর্শন শতাব্দী পরিক্রমায় প্রভাবিত করে এসেছে চিন্তাশীলদের।
বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী: বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী। বিশ্বাস, ভক্তি ও ভালবাসার সহজ সরল শিক্ষার মধ্য দিয়ে যিনি হয়ে উঠেছেন বাংলার লক্ষ ঘরে স্মরণীয় মহামানবে।
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস: শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস। ইংরেজ শাসনাধীন উপমহাদেশে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আত্মিক পুনর্জাগরণের সূচনা করেন। বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের কাছে ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতাকে সমাদৃত করে তোলেন।
স্বামী বিবেকানন্দ: শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর বিশ্বধর্মসভায় তাঁর বিখ্যাত ভাষণ প্রাচ্যের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বিজয়ের সূচনা করে। পাশ্চাত্য অনুভব করতে পারে তাদের অন্তঃসারশূন্যতা। আধ্যাত্মিকতার প্রসারের জন্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বেদান্ত সোসাইটি এবং ভারতে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
হযরত এনায়েত খান: সুফিবাদের আন্তর্জাতিক ধারার প্রবর্তক হযরত এনায়েত খান। ইউরোপ এবং আমেরিকায় তিনিই ধ্যানের এই ধারাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র: ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনি বলেছিলেন, বাংলা জাগলে ভারত জাগবে, ভারত জাগলে জগৎ জাগবে…। একেশ্বরবাদ এবং সকল ধর্ম ও মতসহিষ্ণুতা ছিল তাঁর শিক্ষার ভিত্তি। সবাইকে তিনি মিলিতভাবে সাধনার পথে ডাক দিয়েছেন।
মহাঋষি মহেশ যোগী: মহাঋষি মহেশ যোগী ষাটের দশকে পাশ্চাত্যে বেদান্ত দর্শনকেন্দ্রিক টিএম-কে পরিচিত করান। পরবর্তীতে যা পাশ্চাত্যের মিডিয়া এবং জনজীবনে ধ্যানচর্চাকে জনপ্রিয় করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
দালাই লামা: তিববতের আধ্যাত্মিক নেতা চতুর্দশ দালাই লামা। বুদ্ধের ধ্যান পদ্ধতিকে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞানী মহলে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নতুন যুগের সূত্রপাত: ১৯৬৯-১৯৭০ দশকে মেডিটেশন চর্চায় নতুন যুগের সূত্রপাত হয়। নতুন নতুন পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে। এর মধ্যে টিএম, বা ট্রান্সেনডেন্টাল মেডিটেশন, সহজ যোগ, ন্যাচারাল স্ট্রেস রিলিফ, ফাইভ রিদম, থিটা হিলিং, সিলভা মেথড, ডা. হার্বার্ট বেনসনের রিলাক্সেশন রেসপন্স, ডা. কাবাত জিনের মাইন্ডফুলনেস বা মনোনিবেশায়ন উল্লেখ্যযোগ্য।
২০১৫ সালে জাতিসংঘের ১৭৫ টি দেশ যোগ-মেডিটেশনের মনোদৈহিক উপকারিতার প্রেক্ষিতে ২১শে জুনকে বিশ্ব যোগ দিবস ঘোষণা করে (United Nations A/RES/69/131)। ২০১৫-১৬ বন্ধুদেশ ভারতেও যোগ-মেডিটেশন থেকে সার্ভিস ট্যাক্স প্রত্যাহার করে যোগকে স্থায়ীভাবে ‘Charitable activities’ এর অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে (Notification NO. 20/2015-Service Tax)
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে মেডিটেশন ও ইয়োগা সম্পূরক স্বাস্থ্যসেবা। ২০১৮ সালে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেস প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইয়োগা ও মেডিটেশন কমপ্লিমেন্টারি হেলথ অ্যাপ্রোচ। শরীর ও মনে ভারসাম্য এবং শিথিলায়ন অর্জন করার জন্যে দমচর্চা, মেডিটেশন ও যোগাসন অনুশীলন করা হয়ে থাকে। (ইউএস ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিসটিক্স; নভেম্বর ২০১৮)
আমাদের দেশের চিকিৎসক গবেষকরাও বলছেন ধ্যান বা মেডিটেশন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অংশ। সুস্থ দেহের জন্য যেমন ব্যয়ামের প্রয়োজন, তেমনি মনের সার্বিক সুস্থতার জন্যে প্রয়োজন নিয়মিত মেডিটেশন চর্চার। জাতীয় অধ্যাপক মরহুম ডা. নূরুল ইসলাম বলেছিলেন, মানসিক প্রশান্তি ও সুস্থ জীবনধারা হৃদরোগ নিরাময় করে-এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। তিনি আরও বলেছিলেন, নানা গবেষণা আর চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতামতের ভিত্তিতে সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলেই মেডিকেল সায়েন্সের প্রধান প্রধান বই ও জার্নালগুলোতে এ কথাগুলো ছাপা হয়েছে।
জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগে. (অব) আব্দুল মালিক বলেন, মেডিটেশন আমাদের মনকে শান্ত করে, বর্তমানে নিয়ে আসে, নিজের প্রতি মনোযোগ দিতে শেখায়। টেনশন ও চাপমুক্তি তখন সহজ হয়। এর পাশাপাশি জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষন এবং জীবনধারা পরিবর্তন করাও অত্যন্ত জরুরি। তাই মেডিটেশন এখন বিকল্প চিকিৎসা হিসেব স্বীকৃতি পাচ্ছে। বর্তমান সময়ে যত রোগ হচ্ছে তার একটা বড় অংশের কারণ হলো মানুষের ভুল জীবনযাপন।
কানাডায় ডিপ্রেশন রোধে মেডিটেটিভ ট্রিটমেন্ট বেশ জনপ্রিয়। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার নিয়ন্ত্রণে ২০১৬ সালে ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রকাশ করে কানাডিয়ান নেটওয়ার্ক ফর মুড অ্যান্ড অ্যাংজাইটি। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ইউনিভার্সিটি অব অটোয়া ও ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার একদল মনোবিজ্ঞানী কর্তৃক প্রণীত এই স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় ডিপ্রেশন আক্রান্ত রোগীদের জন্য মেডিটেটিভ ট্রিটমেন্ট হিসেবে ইয়োগা ও আকুপাংচারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (দ্য কানাডিয়ান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি; ২০১৬)
প্রসঙ্গত: অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত অর্থ বছরের বাজেট বক্তৃতায় ‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যে মেডিটেশন সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি আরও এক বছরের জন্যে বৃদ্ধি’র প্রস্তাব করেন।
করোনা মহামারীকালে ২০২০-২১ অর্থবছরেও মেডিটেশন সেবার ওপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সে বছর বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বৈশ্বিক এ দুর্যোগকালে জনগণের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোবল অটুট রাখার স্বার্থে মেডিটেশন সেবার ওপর মূসক অব্যাহতি বলবৎ রাখার প্রস্তাব করছি।
২০১৭-১৮ অর্থ বছরের বাজেটে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনেকে একটি সমাজ কল্যাণমূলক কার্যক্রম হিসেবে আমরা বিবেচনা করবো এবং ধ্যান অথবা যোগ-মেডিটেশনের ওপর আগামী দুই বছরে কোন ভ্যাট আরোপ না করার প্রস্তাব করছি।
২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেটেও তিনি বলেছিলেন, মেডিটেশন সেবা গ্রহণ করে হতাশাগ্রস্ত অনেক মানসিক ও শারীরিক ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ মুক্তির প্রয়াস পায়। সে কারণে মেডিটেশন সেবার ওপর প্রযোজ্য মূসক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
এক কথায় বলা যেতে পারে, মেডিটেশন সেবা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে পারলে একটি জাতি লাভবান হবে। অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবেও। তাই মেডিটেশন সেবার ওপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে একে তৃণমূলে সর্বস্তরে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই অর্থনীতির সমৃদ্ধিসহ সার্বিক উন্নতি দ্রুততর হবে।
ফাহমিদা ইসলাম ফারিয়া

 

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
মন্তব্য
Loading...