নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস

নিউজিল্যান্ডে যখন ঝলমলে রোদ তৃপ্ততা দিচ্ছে তখনও বাংলাদেশে উঁকি দেয়নি সকালের সূর্য। বাংলাদেশের আকাশ অন্ধকারচ্ছন্ন থাকলেও মাউন্ট মঙ্গানুইতে ততক্ষণে আলো ছড়িয়েছে টাইগাররা। তাসমান সাগর পাড়ের দেশের সেই আলোর ঝলকানি পৌঁছে গেছে হাজার মাইল দূরের ১৭ কোটির বাংলাদেশে। কত কত প্রথমের সাক্ষী একটা ম্যাচে কাগজে কলমে লেখা থাকবে শুধুই উইকেটের জয়। লেখা থাকবে না দূর পরবাসে পাঁচটা দিন বীরত্ব দেখিয়ে জয়ের গল্পগাঁথা।

লেখা থাকবে না টেস্ট ক্রিকেটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারানোর বীরত্ব, লেখা থাকবে না কতটা গুমোট আবহাওয়াকে ব্যাটে বলে মিডলিং করে উড়িয়ে দেয়ার প্রবল প্রচেষ্টা। উপমহাদেশের দেশ বাংলাদেশের দুই পেসারের পুরোটা সময় জুড়ে রিভার্স সুইং করানোর গল্পটাও থাকবে উহ্য। সাদা পোশাকের মলিন স্মৃতিতে এই জয় বড্ড প্রশান্তির, বড়ই আনন্দদায়ক। যে গল্পের শুরুটা তরুণ শরিফুল ইসলাম-মাহমুদুল হাসান জয়কে দিয়ে। আর সেই গল্পের শেষটায় শুধুই এবাদত হোসেন।

চতুর্থ দিনের শেষ বিকেলে দুর্দান্ত স্পেলের পর পঞ্চম দিনের শুরুতে রস টেলরকে ফিরিয়ে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ৫ উইকেটের স্বাদ নিয়েছেন এবাদত। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের পেসারদের আক্ষেপ ঘুচিয়েছেন ৯ বছরের। তাতে ইতিহাস গড়ার ম্যাচে ৪০ রানের লক্ষ্য তাড়া করেতে নেমে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮ উইকেটের বড় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে যেকোনো ফরম্যাটে এটিই বাংলাদেশের প্রথম জয়। এদিকে বাংলাদেশের এমন জয়ে ১৭ ম্যাচ পর ঘরের মাঠে টেস্ট হারল কিউইরা।

ইতিহাস গড়তে চতুর্থ দিনের শেষ বিকেলেই কাজটা এগিয়ে রেখেছিল বাংলাদেশ। এবাদতের দুর্দান্ত স্পেলে ম্যাচের লাগাম টেনে ধরে মুমিনুল হকের দল। পঞ্চম দিন সকালে বোলারদের নৈপূণ্যে কেবলই আনুষ্ঠানিকতা সেরেছে টাইগাররা। জয়ের জন্য ৪০ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালো করতে পারেনি সফরকারীরা।

দলীয় মাত্র ৩ রানে টিম সাউদির লেংথ বলে উইকেটকিপার টম ব্লান্ডেলকে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন সাদমান ইসলাম। বাঁহাতি এই ওপেনারের ব্যাট থেকে আসে ৩ রানে। এরপর নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে জুটি গড়েন মুমিনুল। তারা দুজনে মিলে যোগ করেন ৩১ রান। জয় থেকে মাত্র ৬ রান দূরে থাকতে কাইল জেমিসনের একেবারে আউট সাইড অফের বলে খেলতে গিয়ে উইকেট দিয়ে এসেছেন শান্ত।

রস টেলরের দুর্দান্ত ক্যাচে শান্ত আউট হয়েছেন ১৭ রানে। এরপর আর কোনো উইকেট হারাতে দেননি অধিনায়ক মুমিনুল এবং মুশফিকুর রহিম। জেমিসনের বলে চার মেরে বাংলাদেশের ৮ উইকেটের জয় নিশ্চিত করেন মুশফিক। ১৩ রানে অপরাজিত ছিলেন মুমিনুল। এদিকে ২০১১ সালের পর এশিয়ার কোনো দেশের কাছে টেস্ট হারলো নিউজিল্যান্ড। ২০১১ সালে এশিয়ার দেশ হিসেবে পাকিস্তানের কাছে টেস্ট হেরেছিল কিউইরা।

এর আগে ৫ উইকেটে ১৪৭ রান নিয়ে পঞ্চম দিনের খেলা শুরু করে নিউজিল্যান্ড। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরু থেকেই টাইগার পেসারদের তোপের মুখে পড়ে কিউইরা। চতুর্থ দিনের শেষ বিকেলে যেখান থেকে শেষ করেছিলেন পঞ্চম দিনের সকালটা সেখান থেকেই যেন শুরু করলেন এবাদত। নিজের প্রথম ওভারেই গুড লেংথের বলে ৪০ রান করা টেলরকে বোল্ড করেছেন ডানহাতি এই পেসার।

আর তাতেই টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ৫ উইকেট নেয়ার কীর্তি গড়েন তিনি। ২০১৩ সালে সর্বশেষ বাংলাদেশের কোনো পেসার ৫ উইকেট পেয়েছিলেন। সেবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৭১ রানে ৬ উইকেট শিকার করেছিলেন রবিউল ইসলাম। দীর্ঘ ৮ বছর এবং ৪৭ টেস্ট পর সেই আক্ষেপ ঘুচালেন এবাদত।

পঞ্চম উইকেট নেয়ার পর ষষ্ঠ উইকেট পেতেও খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি এবাদতকে। সেখানে অবশ্য বড় কৃতিত্ব শরিফুল ইসলামের। নিজের দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে কাইল জেমিসনকে শূন্য রানে ফিরিয়েছেন এবাদত। তার করা লেগ স্টাম্প বরাবর বল ফ্লিক করতে চেয়েছিলেন জেমিসন। যদিও শরিফুলের ডাইভিং ক্যাচে সাজঘরে ফিরতে হয় তাকে।

এরপর ১৬ রান করা রাচিন রবীন্দ্রকে নিজের শিকার বানান তাসকিন আহমেদ। টিম সাউদিকেও রানের খাতা খোলার আগেই বোল্ড ফিরিয়েছেন এই পেসার। কিউইদের শেষ ব্যাটার ট্রেন্ট বোল্ডকে ফিরিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এই স্পিনারকে মিড উইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে সাবস্টিটিউট ফিল্ডার তাইজুল ইসলামের ডাইভিং ক্যাচে ১৬৯ রানে আউট অল আউট হয়ে যায় নিউজিল্যান্ড।

 

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
মন্তব্য
Loading...