আনোয়ার হোসেন: এক কিংবদন্তির বিদায়

0
847
২০১৬ সালে ডিসিসিআই কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনোয়ার হোসেনকে ‘ইলাস্ট্রিয়াসসন অব ঢাকা’ উপাধিতে ভূষিত করেন

দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প পরিবার আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর অভিভাবক আনোয়ার হোসেন আমাদের মাঝে নেই! সম্প্রতি রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন ১৯৩৮ সালের ৩০ অক্টোবর পুরান ঢাকার আমলী গোলায় এক অভিজাত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের শিল্পবিপ্লবের এক অসাধারণ যোদ্ধা আনোয়ার হোসেন দেশের উন্নয়ন আর অগ্রযাত্রার অন্যতম অংশীদার হিসেবে সমাদৃত। দৃঢ় চিত্তের এই ব্যক্তিত্বের কর্মজীবন শুরু হয় মাত্র বারো বছর বয়সে। তার বাবা রহিম বখস্ ও মা জামিলা খাতুন। মাত্র সাত বছর বয়সে পিতৃ বিয়োগের পর মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধাকে সম্বল করে এগিয়ে চলে তার সংগ্রামী জীবন।

সাত দশকেরেও বেশি সময় ধরে দেশের শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণে রেখেছেন অসামান্য অবদান। দেশের মানুষের জন্য নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করার অদম্য স্পৃহা থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন নানাবিধ শিল্প-প্রতিষ্ঠান, প্রথম বেসরকারী ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড, অন্যতম শীর্ষ স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফাইন্যান্স লিমিটেড, বীমা কোম্পানী সিটি জেনারেল ইন্সুরেন্সসহ বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বস্ত্র, প্রকৌশল, গাড়ি, আসবাব, আবাসন, অবকাঠামো, অর্থনীতি, কর্মনংস্থানসহ বিভিন্নখাতে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তিনি যেখানেই দৃষ্টি দিয়েছেন সেখানেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশের শাড়ীর জগতে সাড়া জাগানো প্রথম শাড়ীর ব্রান্ড ‘মালা’ শাড়ী ব্যাপক পরিচিতি এনে দিয়েছিল ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনকে। ১৯৫৩ সালে ব্যবসা শুরু করা এই শিল্প উদ্যোক্তা দেড় দশক পর প্রতিষ্ঠা করেন আনোয়ার সিল্ক মিলস। মালা শাড়ী বাজারে আনার পর আর পিছনে তাকাতে হয়নি আনোয়ার হোসেনকে। এরপর বাড়তে থাকে তার ব্যবসার পরিধি। গড়ে তুলেন প্রায় ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেখানে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। তার উদ্ভাবনী চিন্তাধারা, দূরদর্শী এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গড়ে তুলা এসব প্রতিষ্ঠান দেশের সামগ্রীক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখছে। তিনি ১৯৮২ সাল থেকে শুরু করে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ্কাধিক বার সিআইপি মর্যাদা অর্জন করেন। কর্ণধার হয়েছেন দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।

দেশের ক্রীড়া ও সংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিমন্ডলেও রয়েছে তার বিশেষ অবদান। তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকার ৮ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। সে সময় সরকারের সহোযোগিতায় ও তার একান্ত প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়েছিল ঢাকার বুড়িগঙ্গায় বেড়িবাঁধ। তখন বুড়িগঙ্গার বন্যার কবল থেকে ঢাকাবাসীকে রক্ষা করলেও এখন যা ঢাকার নাগরীকদের চলাচলের সহজতম সড়ক। সে সময় তিনি লালবাগ, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচরসহ সার্বিক উন্নয়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। রাস্তায় রাস্তায় সোডিয়ামলাইট, টিউবলাউট ব্যবস্থা করে জনমানুষের চলাচলকে সহজ ও নিরাপদ করেছিলেন। সব সময় এলাকার ছোট-বড় সব সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।

সত্য ও ন্যয়ের পথে থেকে সারা জীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন শিল্পখাতের এই সফল আইকন। সমাজ সেবাতেও তিনি রেখেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্কুল, মাদ্রাসা, এতিমখানা, মাতৃসদন ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, দাতব্য চিকিৎসালয়সহ বেশ কিছু সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলো জামিলা খাতুন লালবাগ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, জামিলাখাতুন রেডক্রিসেন্ট মাতৃসদন ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র, আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন শহীদ নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়, রিয়াদুল মুসলিমাত শিশুশিক্ষালয় ও মাদ্রাসা, রহিমবখস্ দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র।

দানশীল মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন বিশেষভাবে সুপরিচিত। স্কুল, কলেজ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ছাড়াও ব্যক্তিগত আগ্রহে তিনি দারিদ্র দূরীকরণ এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক মানুষদের সহায়তা করেছেন। আনোয়ার হোসেন কেবল মাত্র্ একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, সকলের কাছে তিনি পরিচিত সদালাপী, নিরহংকার ও মহৎ হৃদয়ের মানুষ হিসেবে। সাধারণ মানুষের প্রতি অসীম ভালোবাসা ও মমত্ববোধ, তার নিষ্ঠা আর সততা আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।

দেশের শিল্পায়ন ও সমাজ সেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে ডিসিসিআই কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ‘ইলাস্ট্রিয়াসসন অব ঢাকা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়াও অতীশ দীপংকর স্বর্ণপদক, মওলানা ভাসানী জাতীয় পুরস্কার, মাওলানা আকরাম খাঁ স্মৃতিসংসদ স্বর্ণপদক, শেরেবাংলা স্মৃতিপুরস্কার, ১২তম বাংলাদেশ বিজনেস এওয়ার্ড (ডিএইচএল-দি ডেইলি স্টার)সহ অসংখ্য পদক ও সন্মাননা লাভ করেছেন তিনি।

লেখক- মো. ইমরান হোসাইন, কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স লিমিটেড

অর্থসূচক/এএইচআর