রেকর্ড ৬ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা

করোনায় ঘুরে দাঁড়ানোর বাজেট

0
267

করোনাভাইরাস অতিমারির কারণে বিশেষ সময় পার করছে দেশ। সংকটে মানুষের জীবন ও জীবিকা। অর্থনীতি আছে প্রচণ্ড চাপে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হলেও এর হার কমেছে। অর্থনীতির অনেক সূচকই নড়বড়ে। করোনার থাবায় বেশির ভাগ মানুষের আয় কমে গেছে। দারিদ্র সীমার নিচে নেমে গেছে প্রায় দেড় কোটি মানুষ। আয় কমলেও ব্যয় কমেনি। বরং স্বাস্থ্যসহ নানা খাতে ব্যয় বেড়েছে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ-সব ধরনের শিল্প ও ব্যবসা আছে চাপের মুখে। এমন বাস্তবতায় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

আজ বৃহস্পতিবার (৩ জুন) আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য শতাংশ ঘাটতি ধরে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন তিনি।

আজ বিকেলে সংসদের অধিবেশন শুরুর পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর অনুমোদনক্রমে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন অর্থমন্ত্রী। এটি দেশের ৫০তম এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে মুস্তফা কামালের তৃতীয় বাজেট।

বাজেটের আকার:

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এবারের বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ৩৫ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা বেশি। আর চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে এটি ৬৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বেশি।

প্রস্তাবিত বাজেট জিডিপির ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ ৩৭৮ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা।

মোট আয়:

আগামী বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১১ হাজার কোটি টাকা।

মোট আয়ের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও এনবিআরকে একই পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া রয়েছে। প্রথমবারের মতো এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে না।

এনবিআরবহির্ভূত করের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে কর ছাড়া প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। আর বৈদেশিক অনুদান থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

মোট ব্যয়:

নতুন বাজেটের ব্যয়ের খাতগুলোর মধ্যে সরকারের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এর মধ্যে আবর্তক ব্যয় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ হিসেবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ৬ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। এছাড়া উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা, ঋণ ও অগ্রিম ৪ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা এবং খাদ্য হিসাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯৭ কোটি টাকা।

এডিপি:

বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে দুই লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা।

ঘাটতি:

উন্নয়নশীল দেশগুলো সাধারণত ঘাটতি বাজেট দিয়ে থাকে। বাংলাদেশও প্রতি অর্থবছর ঘাটতি বাজেট দেয়। করোনাভাইরাসের কারণে এই ঘাটতি এবার সব সীমা অতিক্রম করছে। ঘাটতির পরিমাণ ধরা হচ্ছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। যা জিডিপির ৬.২ শতাংশ। বর্তমান বাজেটে এই হার ধরা আছে ৬.১ শতাংশ

ঘাটতি পূরণ:

দেশি-বিদেশি দুই উৎস থেকে আসবে ঘাটতি পূরণের অর্থ। দেশীয় উৎস মূলত ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া ঋণ। আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা।

অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নেবে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। আর জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেবে ৩২ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে নেওয়া হবে ৫ হাজার ১ কোটি টাকা।

প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি :

আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি ৫.৩ শতাংশের মধ্যে সহনীয় পর্যায়ে রাখার কথা বলা হয়েছে।

সংশোধিত বাজেট :

প্রতি অর্থবছরই ঢাউস সাইজের বাজেট দিয়ে অর্থবছরের মাঝামাঝিতে তা সংশোধন করা হয়। চলতি অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষনা করা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটে তা ২৯ হাজার ১৯ কোটি টাকা কমিয়ে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে করা হয়েছে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এনবিআরকে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কিছুটা কমিয়ে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এটি জিডিপির ৬.১ শতাংশ।