এমার্জিং মার্কেটের পথে দেশের পুঁজিবাজারঃ বিএসইসি চেয়ারম্যান

0
950

দেশের অর্থনীতির তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে আমাদের পুঁজিবাজার। তবে দ্রুতই এ অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। বড় কিছু সংস্কার শুরু হয়েছে বাজারে। চালু হতে যাচ্ছে নতুন নতুন পণ্য। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ ফ্রন্টিয়ার মার্কেট (Frontier Market) থেকে এমার্জিং মার্কেটে (Emerging Market) উন্নীত হতে পারে।

আজ শনিবার (১৩ মার্চ) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক অর্থনীতি ও ব্যবসা বিষয়ক মাসিক সংলাপে বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এ আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। ইআরএফ সভাপতি শারমিন রিনভী এতে সভাপতিত্ব করেন। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এসএম রাশিদুল ইসলাম।

তিনি বলেছেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বিএসইসি নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে নতুন কিছু ট্রেক ইস্যু করা হবে। এক বছরের মধ্যে সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি, স্মল ক্যাপ বোর্ড ও অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট বোর্ড কার্যক্রম শুরু করবে। বাজারে ইক্যুইটি শেয়ারের উপর নির্ভরতা কমাতে কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এছাড়া কমোডিটি মার্কেট, ফরোয়ার্ড মার্কেট, ডেরিভেটিভসসহ নানা প্রোডাক্ট চালুরও প্রস্তুতি চলছে। আর এসব উইং ও পণ্য চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিএআইসিএম) এবং বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটের (বিএএসএম) কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোড শো আয়োজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিচিতি বাড়ানো ও ভাবমূর্তি উন্নয়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, এতদিন বিদেশীদের কাছে দেশের সব নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে। তারা আমাদের ভাল দিকগুলো সম্পর্কে জানেন না। আমাদের অর্থনীতি যে অনেক ভাল করছে, আমাদের যে অনেক সম্ভাবনা আছে-এসব তথ্য বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তেমন জানেন না। তাই পুঁজিবাজার ও দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য বিএসইসি বিভিন্ন দেশে রোড শো আয়োজন শুরু করেছে, দুবাই শহরে রোড শো আয়োজনের মাধ্যমে যা শুরু হয়েছে। ওই রোড শোর পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যোগাযোগ শুরু করেছেন বলে তিনি জানান।

বিএসইসি অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আগামী জুন মাসে ক্রেডিট এগ্রো সুইচ সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে একটি রোড শোর আয়োজন করছে। এটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।

তিনি শিল্প-বাণিজ্যের অর্থায়নে ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে এটিকে পুঁজিবাজার নির্ভর করে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে সব সময় অনুকূল পরিবেশ থাকে না। নানা প্রতিকূলতা এবং করোনার মতো হঠাৎ সৃষ্ট সংকটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তখন ব্যাংক ঋণের কিস্তু শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেলাপিতে পরিণত হন অনেক উদ্যোক্তা। তাতে তাদের মালিকানাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও সমস্যায় পড়তে হয়। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এই ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব।

তবে বিএসইসির চাওয়া সত্ত্বেও লাভজনক বড় কোম্পানিগুলো নানা কারণে তালিকাভুক্ত হতে চায় না। তাদেরকে আগ্রহী করে তুলতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমিয়ে তালিকা বহির্ভূত কোম্পানির সাথে করের ব্যবধান বাড়াতে হবে। বর্তমানে এই ব্যবধান সাড়ে ৭ শতাংশ। এটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার জন্য বিএসইসি অর্থমন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে একটা শক্ত অবস্থানে আছে। আমাদের দেশের ইকোনোমিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। আমরা আমাদের আশপাশে শক্ত সামর্থ্য বেশ কিছু দেশ পেয়েছি। যাদের মাধ্যমে আমরা ভালো ফল পেতে পারি। আমাদের লোকেশনটাকে আমরা যদি ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে অনেক ভালো করা সম্ভব।

বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের পুঁজিবাজারের মূলধন সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা ছিল। বর্তমানে এটি পাঁচ লাখ কোটি টাকার আশেপাশে অবস্থান করছে। চলতি বছরের মধ্যে এটি আরও অনেক বেড়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একেকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিকচিত্র একেকরকম। তাইসবার জন্য একই সীমা নীর্ধারণ করে দেওয়া উচিত নয়। এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে জোরালো সমন্বয় দরকার। এ লক্ষ্যে আগামী ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধ দল বিএসইসির সাথে বৈঠক করবে বলে জানান তিনি।

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা বাড়াতে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। এ অংশ হিসেবে আইসিএবির সাথে বিএসইসি ও এফআরসি একটি চুক্তি সই করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তাতে সই করবে। ফলে আইসিএবিতে থাকা একটি কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন যে কোনো নিয়ন্ত্রক সস্থা পরীক্ষা করতে পারবে। ফলে একটি কোম্পানি ব্যাংকের জন্য একরকম, এনবিআরের জন্য অন্য রকম এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকরকম আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করতে পারবে না।

বাংলাদেশে বিদেশীদের বিনিয়োগের সময় এখনই উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশ যে গতিতে এগুচ্ছে তাতে আগামী ৩০ বছর পর আমাদের আর বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে না। তখন আমরাই বিদেশে বিনিয়োগ করতে পারবো। ইতোমধ্যে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী বন্ডে ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের জন্য ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই এই দুই খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।