সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সেশন ফি কমানোর দাবি ‘অযৌক্তিক’

হৃদয় আলম, নাজমুল হুদা

0
237

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা সেশন ফি কমানোর দাবি করছেন। তাদের এ দাবি ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, চাইলেই হুটহাট করে সব কিছু করা যায় না। সব কিছুরই একটা প্রক্রিয়া রয়েছে।

করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজধানী ছেড়েছেন ঢাকায় পড়ুয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। স্বল্প ও মধ্যবর্তী পরিবারের এসব শিক্ষার্থীদের দাবি, মহামারির কারণে তাদের পরিবারে সদস্যদের আয় কমেছে কয়েকগুণ। তাই দৈনন্দিন খরচ মেটানোর পর শিক্ষার্থীদের মোটা অঙ্কের সেশন ফি দেওয়া সম্ভব না।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এই সাত কলেজে মোট শিক্ষার্থী প্রায় দুই লাখ।

ঢাবি অধিভুক্ত এই সাত কলেজের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ক্ষেত্র বিশেষ বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সেশন ফি (২০১৭-১৮ সেশন) নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ৩২২ টাকা থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা। এর সাথে যুক্ত হবে একই বর্ষের ফরম পূরণের টাকা।

শিক্ষার্থীরা এই সেশন ফি না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকে আবার সেশন ফি কমানোর দাবি করেছেন। তারা বলছেন, পুরোপুরি বাদ না দিলেও সেশন ফি যেনো অন্তত অর্ধেক করা হয়।

তিতুমীর কলেজের ১৭-১৮ সেশেনের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রবিন আকরাম বলেন, বাবা নাই, ঘরে মা অসুস্থ তাই ছোট একটা চাকরি করে কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। মায়ের জন্য ওষুধ লাগে প্রতি মাসে প্রায় ২/৩ হাজার টাকা। ১০ হাজার টাকার চাকরি করে সংসার চালানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে করোনাভাইরাসে সব কিছু এলোমেলো। আর হুট করেই তিনদিন আগে সেশন ফি, ভর্তির নোটিশ। এতগুলো টাকা এক সাথে কিভাবে দিবো বুঝতে পারছি না। ঘর ভাড়া থাকা খাওয়া মায়ের ওষুধ সব মিলিয়ে চলতেই কষ্ট হয়। মহামারিতে টাকার অভাবে সবগুলো বইও কিনতে পারিনি। করোনায় যেহেতু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিলো তাই সেশন ফি মওকুফ করার দাবি জানাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ফলে না চড়েছি বাসে, না ক্লাসের বিদ্যুৎ সুবিধা নিয়েছি। অন্তত এই ফি গুলো মওকুফ করা হোক। স্বল্প এ সময়ে এতগুলো টাকা পরিশোধ করবো না মায়ের জন্য ঔষুধ কিনবো, না সংসার চালাবো!

ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সুমি রহমান বলেন, করোনাকালীন সময়ে হুট করেই ৩য় বর্ষে সেশন ফি পরিশোধের নোটিশ দেয়া হয়। সময়ও দেয়া হয় মাত্র ৩ দিন। এমনিতেই করোনায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় তারপর এতগুলো টাকা একসাথে। একসাথে মাত্র তিনদিনে এতগুলো টাকা দেয়া প্রায় অসম্ভব। কলেজের প্রশাসন থেকে অন্তত কিছু টাকা মওকুফ করা উচিত। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি একটু বিবেচনা করা উচিত।

বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী আলাউদ্দিন বলেন, করোনা ভাইরাসে আমার পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। আব্বুর একটা ছোট চাকরি ছিল সেটাও হারিয়ে ফেলেন। অনেক কষ্ট করে একটা চাকরি ম্যানেজ করলে পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে কষ্ট হয়। ছোট একটা টিউশনি করে নিজের হাত খরচ চালিয়ে থাকি কোন রকমে। কিন্তু হঠাৎ সেশন ফি ও ফরমপূরণের এতগুলো টাকা প্রদান করার নির্দেশ দেয়াতে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। না পারছি বাসায় বলতে না পারছি টাকা ম্যানেজ করতে। এমনিতেই করোনার ফলে আর্থিক অবস্থা গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। হুট করে এতগুলো টাকা যোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। এখন কি করবো বুঝতেছি না। কলেজ প্রশাসনের কাছে আবেদন করছি আমাদের দিক টা যেন একটু বিবেচনা করে।

শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আশরাফ হোসেন অর্থসূচককে বলেন, নতুন কোনো পরিপত্র না পেলে আমরা কিছু করতে পারি না। আমরা তো চাইলেই আর কিছু হয় না। আমাদের একটা বছর এই টাকা দিয়ে চলতে হয়। ঢাবি নির্দেশনা দিলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারতাম।

সরকারি বাঙলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ফেরদৌসি খান অর্থসূচককে বলেন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের তো ভালোই হতো। কিন্তু এটা আমাদের হাতে নেই। ঢাবি নির্দেশনা দিলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারতাম।

সাত কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত (ফোকাল পয়েন্ট) ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার অর্থসূচককে বলেন, টাকা পয়সা তো এভাবে কমানো যাবে না। সব কিছুরই একটা প্রক্রিয়া আছে। আমাদের তো শত শত প্রতিষ্ঠান আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য আছে। সরকারি ট্রেজারি খরচসহ অনেক ধরনের খরচ রয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপন ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও সাত কলেজের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক এ এস এস মাকসুদ কামালের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, ২৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সাত কলেজের প্রধান সমন্বয়ক ও অধ্যক্ষদের এক সভায় সাত কলেজের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। সে সময় তাৎক্ষণিকভাবে ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং হল-ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবিতে নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

রাতে শিক্ষার্থীরা ফিরে গেলেও বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে আবার তারা নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওইদিন দুপুরে শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করলে শাহবাগ পর্যন্ত সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নগরীর বড় অংশজুড়ে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দুপুরে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়।

বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য এবং সাত কলেজের অধ্যক্ষরা ওই ভার্চুয়াল সভায় অংশ নেন।

ওইদিন বিকেল পৌনে ৪টার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এলে সড়কে অবস্থান নিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।

অর্থসূচক/এমএস