বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শেয়ারে ধস, নিরাপদ বিনিয়োগে বন্ডমুখী হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগে বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পুঁজিবাজার সূচকগুলো থেকে একদিনে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়ে যাওয়ার পর নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ইউরোপ ও এশিয়ার পুঁজিবাজারেও দরপতনের ধারা অব্যাহত থাকে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ইউরোপের FTSEurofirst ও STOXX 600 সূচক লেনদেনের শুরুতে ১ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর আগে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। এতে সূচকটির বাজারমূল্য থেকে প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়ে যায়। একই দিনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকেও প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার কমে যায়।

এশিয়ার পুঁজিবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ও দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক প্রায় ৬ শতাংশ করে কমেছে। তাইওয়ানের পুঁজিবাজার দিনের একপর্যায়ে ৮ শতাংশের বেশি পড়ে গেলেও পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত সূচকটি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে লেনদেন শেষ করে। পুরো সপ্তাহে সূচকটির পতন দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ, যা ১৯৯১ সালের পর সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক পতন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতের অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পুঁজিবাজারে অস্থিরতার বিপরীতে সরকারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জার্মানির সরকারি বন্ডের সুদহার কমেছে, যা বন্ডের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে মার্কিন ডলার, জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁর প্রতিও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে।

স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান ফিক্সড ইনকাম কৌশলবিদ মাসাহিকো লু বলেন, বন্ডবাজার আবারও প্রচলিত ধারায় আচরণ করছে। বিনিয়োগের আয় এখন রিটার্নের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে এবং বন্ডের ঐতিহ্যগত ঝুঁকি-বৈচিত্র্যকরণের সুবিধা ফিরে আসছে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এআই খাতের ভবিষ্যৎ চক্র নিয়ে নয়, বরং এআই নীতিমালার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রতিফলন।

এদিকে পুঁজিবাজারের অস্থিরতা কমাতে এশিয়ার কয়েকটি দেশের কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া খুচরা বিনিয়োগকারীদের লিভারেজড বিনিয়োগের নিয়ম সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের অর্থ মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের পুঁজিবাজারে সহায়তা দিতে নির্দেশ দিয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

তবে পুঁজিবাজারে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক রয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদে শেয়ার অতিরিক্ত বিক্রির কারণে কিছুটা পুনরুদ্ধার হতে পারে। তবে এআই খাতের বিপুল বিনিয়োগ, সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে যে মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা সহজে কাটবে না।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.